|
মাধ্যমিক বাংলা সাজেশন ও
সম্পূর্ণ মডেল প্রশ্নোত্তর সংকলন কবিতা: তিনপাহাড়ের কোলে
— কবি: শক্তি চট্টোপাধ্যায় | |
|
বিভাগ ক: ১০০টি অতি সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী
প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১) |
প্রশ্ন: ১. 'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতাটির রচয়িতা কে?
উত্তর: শক্তি চট্টোপাধ্যায়।
প্রশ্ন: ২. যাত্রীরা কখন তিনপাহাড়ে পৌঁছেছিলেন?
উত্তর: অন্ধকারে (রাত্রিকালে)।
প্রশ্ন: ৩. যাত্রীরা কিসে চড়ে তিনপাহাড় স্টেশনে এসেছিলেন?
উত্তর: ট্রেনে চড়ে।
প্রশ্ন: ৪. 'হাওয়াবিলাসী' বলতে কবিতায় কাদের বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: শহুরে একঘেয়ে যান্ত্রিক
জীবন ছেড়ে প্রকৃতির মুক্ত বাতাস ও সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা তিন বন্ধুকে।
প্রশ্ন: ৫. কবিতায় কয় জোড়া চোখের উল্লেখ আছে?
উত্তর: তিনজোড়া চোখ।
প্রশ্ন: ৬. তিনজোড়া চোখ কোথায় আটকে গেল?
উত্তর: প্রকৃতির মোহময় নৈসর্গিক
রূপের ফ্রেমে।
প্রশ্ন: ৭. রাতের তিনপাহাড় স্টেশনটি কেমন ছিল?
উত্তর: সম্পূর্ণ জনমানববিহীন
ও নিস্তব্ধ।
প্রশ্ন: ৮. রাতের আকাশে কীসের সমাহার ছিল?
উত্তর: আকাশ ভরা ছিল উজ্জ্বল
তারায়।
প্রশ্ন: ৯. এমন দেশে আসলে সকলের কী ঘটে?
উত্তর: সকলে পথ হারায়।
প্রশ্ন: ১০. পথ হারিয়ে যেদিকেই যাওয়া যায়, সেদিকে কী আছে?
উত্তর: সেদিকেই নতুন চলার
পথ রচিত আছে।
প্রশ্ন: ১১. বনভূমির কাছাকাছি কী কী প্রাকৃতিক উপাদান
রয়েছে?
উত্তর: ঝরনা, কাঁদড়, টিলা
ও পাথর।
প্রশ্ন: ১২. 'কাঁদড়' শব্দটির অর্থ কী?
উত্তর: পাহাড়ি ছোট নালা,
খানাখন্দ বা নিচু জলপ্রণালী।
প্রশ্ন: ১৩. বনভূমির ওপারে কোন দহের কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: 'মনোভূমির দহ' অর্থাৎ
মানুষের মনের অতলান্ত গভীরে থাকা অনুভূতির কথা।
প্রশ্ন: ১৪. 'দহ' শব্দের সাধারণ আক্ষরিক অর্থ কী?
উত্তর: নদী বা জলাশয়ের গভীর
গহ্বর বা ঘূর্ণিজল।
প্রশ্ন: ১৫. স্বপ্নে কেমনভাবে কথা হয় বলে কবি উল্লেখ করেছেন?
উত্তর: 'ফুসুর ফাসুর ঘুসুর
ঘাসুর' মৃদু ফিসফিসানি সুরে।
প্রশ্ন: ১৬. আলোর ঘোমটা কোন আকাশে উন্মোচিত হয়?
উত্তর: পুব আকাশে।
প্রশ্ন: ১৭. পুব আকাশে আলো কীভাবে ফোটে?
উত্তর: আস্তে-ধীরে, পরম
শান্ত স্নিগ্ধতায়।
প্রশ্ন: ১৮. 'শক্ত সবুজ গাঁ' কোথায় ভেসে উঠেছে?
উত্তর: তিনপাহাড়ের কোলে।
প্রশ্ন: ১৯. গ্রামটিকে কবি 'শক্ত' এবং 'সবুজ' উভয় বিশেষণে
ভূষিত করেছেন কেন?
উত্তর: পাহাড়ি পাথুরে মাটির
রুক্ষ দৃঢ়তা ('শক্ত') এবং অরণ্যের সতেজ শ্যামল প্রাণশক্তি ('সবুজ')—উভয়ের সমন্বয়ে গড়ে
ওঠার কারণে।
প্রশ্ন: ২০. খাঁচাতে কী সম্ভব নয় বলে কবি প্রশ্ন তুলেছেন?
উত্তর: সহজ ও স্বাভাবিকভাবে
মনের আনন্দে বেঁচে থাকা।
প্রশ্ন: ২১. কবিতার শেষ চরণে কার কলবর শোনা যায়?
উত্তর: শিশুর আনন্দময় কলবর।
প্রশ্ন: ২২. তিনপাহাড়ের উপত্যকাটিকে কবি কিসের সাথে তুলনা
করেছেন?
উত্তর: লোকশিল্পের প্রতীক
'নকশিকাঁথা'র সাথে।
প্রশ্ন: ২৩. কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম কত সালে হয়েছিল?
উত্তর: ১৯৩৩ সালের ২৫শে
নভেম্বর।
প্রশ্ন: ২৪. শক্তি চট্টোপাধ্যায় কত সালে প্রয়াত হন?
উত্তর: ১৯৯৫ সালের ২৩শে
মার্চ।
প্রশ্ন: ২৫. শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জন্মস্থান কোথায়?
উত্তর: দক্ষিণ ২৪ পরগনার
বহড়ু গ্রামে।
প্রশ্ন: ২৬. শক্তি চট্টোপাধ্যায় কলকাতার কোন ঐতিহ্যবাহী
কলেজে পড়াশোনা করেছিলেন?
উত্তর: প্রেসিডেন্সি কলেজে।
প্রশ্ন: ২৭. কবি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য
বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন?
উত্তর: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে।
প্রশ্ন: ২৮. বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত কোন পত্রিকায় কবির
প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়?
উত্তর: 'কবিতা' পত্রিকায়।
প্রশ্ন: ২৯. সাহিত্যজগতে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে কোন কবিতা
প্রকাশের মাধ্যমে?
উত্তর: 'যম' কবিতাটির মাধ্যমে।
প্রশ্ন: ৩০. শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ
কোনটি?
উত্তর: 'হে প্রেম, হে নৈঃশব্দ্য'
(১৯৬১)।
প্রশ্ন: ৩১. শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রকাশিত মোট কাব্যগ্রন্থের
সংখ্যা কয়টি?
উত্তর: ৫১টি।
প্রশ্ন: ৩২. তাঁর প্রণীত, অনূদিত ও সম্পাদিত মোট বইয়ের
সংখ্যা কত?
উত্তর: ১১১টি।
প্রশ্ন: ৩৩. 'ধর্মে আছি জিরাফেও আছি' কার লেখা কাব্যগ্রন্থ?
উত্তর: শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের।
প্রশ্ন: ৩৪. 'হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান' কী ধরনের
রচনা?
উত্তর: শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের
একটি সুবিখ্যাত মৌলিক কাব্যগ্রন্থ।
প্রশ্ন: ৩৫. 'সোনার মাছি খুন করেছি' কাব্যগ্রন্থটির রচয়িতা
কে?
উত্তর: শক্তি চট্টোপাধ্যায়।
প্রশ্ন: ৩৬. 'যেতে পারি কিন্তু কেন যাব' কাব্যগ্রন্থটির
স্রষ্টা কে?
উত্তর: কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়।
প্রশ্ন: ৩৭. শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখা দুটি জনপ্রিয় উপন্যাসের
নাম লেখো।
উত্তর: 'কুয়োতলা' ও 'অবনী
বাড়ি আছো?'।
প্রশ্ন: ৩৮. শক্তি চট্টোপাধ্যায় ষাটের দশকের কোন প্রখ্যাত
সাহিত্য পত্রিকার সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন?
উত্তর: 'কৃত্তিবাস' পত্রিকার
সাথে।
প্রশ্ন: ৩৯. কাব্যজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করতে তিনি কোন সাময়িকপত্রটি
প্রকাশ করেছিলেন?
উত্তর: 'কবিতা সাপ্তাহিকী'।
প্রশ্ন: ৪০. বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি কোন পদে আসীন
ছিলেন?
উত্তর: 'অতিথি অধ্যাপক'
(Guest Professor) হিসেবে।
প্রশ্ন: ৪১. বিশ্বভারতীতে অধ্যাপনাকালে তাঁর প্রয়াণ কীভাবে
ঘটে?
উত্তর: আকস্মিক হৃদরোগে
(Heart Attack) আক্রান্ত হয়ে।
প্রশ্ন: ৪২. শক্তি চট্টোপাধ্যায় কী কী মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য
পুরস্কার অর্জন করেছিলেন?
উত্তর: 'আনন্দ পুরস্কার',
'রবীন্দ্র পুরস্কার' এবং 'সাহিত্য অকাদেমি' পুরস্কার।
প্রশ্ন: ৪৩. 'তিনজোড়া চোখ' দ্বারা কবি কয়জন পর্যটককে নির্দেশ
করেছেন?
উত্তর: তিনজন পরিভ্রমণকারী
বন্ধুকে।
প্রশ্ন: ৪৪. 'ফ্রেমে আটকে গেল' কথাটির নিহিতার্থ কী?
উত্তর: প্রকৃতির অপরূপ স্থির
সৌন্দর্যে চোখ বিস্ময়ে নিস্পন্দ হয়ে যাওয়া।
প্রশ্ন: ৪৫. 'জনমানববিহীন স্টেশন' শব্দবন্ধে কোন ভাব প্রকাশ
পায়?
উত্তর: নিঝুম রাতের পাহাড়ি
নিস্তব্ধতা ও লোকশূন্য নির্জনতা।
প্রশ্ন: ৪৬. 'আকাশ ভরা তারায়'— এই দৃশ্য কিসের প্রতীক?
উত্তর: দূষণমুক্ত, মেঘহীন
ও আদিম নির্মল প্রকৃতির প্রতীক।
প্রশ্ন: ৪৭. 'সক্কলে' শব্দটির ব্যাকরণগত পরিচয় কী?
উত্তর: 'সকল' শব্দের কথ্য
বা উপভাষাগত কোমল রূপ।
প্রশ্ন: ৪৮. কবিতায় 'পথ হারানো' ইতিবাচক না নেতিবাচক অনুভূতি?
উত্তর: পরম আনন্দের ইতিবাচক
অনুভূতি।
প্রশ্ন: ৪৯. ঝরনা ও কাঁদড় কীসের প্রতীকী ব্যঞ্জনা বহন
করে?
উত্তর: প্রকৃতির বহমানতা,
সজীবতা ও নির্মল ধারা।
প্রশ্ন: ৫০. 'টিলা' শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: ছোট পাহাড় বা মাটির
উঁচু ঢিবি।
প্রশ্ন: ৫১. 'মনোভূমি' শব্দের ব্যুৎপত্তিগত ভাবার্থ কী?
উত্তর: মানুষের অন্তর্জগৎ
বা মনের গহন ভাবনালোক।
প্রশ্ন: ৫২. 'ফুসুর ফাসুর ঘুসুর ঘাসুর' শব্দদ্বয় কী ধরনের
শব্দ?
উত্তর: অনুকরণমূলক ধ্বন্যাত্মক
দ্বিরুক্ত শব্দ।
প্রশ্ন: ৫৩. 'আলোর ঘোমটা খোলে' পঙক্তিতে কোন রূপক ফুটে
উঠেছে?
উত্তর: ভোরের স্নিগ্ধ সূর্যোদয়কে
লাজুক বধূর ঘোমটা উন্মোচনের সাথে তুলনা করা হয়েছে।
প্রশ্ন: ৫৪. 'শক্ত সবুজ গাঁ'— শব্দবন্ধে 'শক্ত' শব্দটি
কিসের পরিচয় দেয়?
উত্তর: পাথুরে কাঁকুরে মাটির
রুক্ষ কাঠিন্যের।
প্রশ্ন: ৫৫. 'সবুজ' শব্দটি দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: গাছপালা ও শস্যের
চিরন্তন প্রাণময় সজীবতা।
প্রশ্ন: ৫৬. 'খাঁচাতে' বলতে কবি কোন জীবনকে চিহ্নিত করেছেন?
উত্তর: শহুরে যান্ত্রিক,
কৃত্রিম ও সংকীর্ণ বন্ধনযুক্ত জীবনকে।
প্রশ্ন: ৫৭. 'নকশিকাঁথা' কিসের প্রতীক?
উত্তর: বাংলার চিরায়ত লোকশিল্প,
নারীর মমতা ও বিচিত্র রঙের সমন্বয়।
প্রশ্ন: ৫৮. শিশুর কলবর কীসের বার্তা ঘোষণা করে?
উত্তর: ভবিষ্যতের উন্মুক্ত
আশা, অফুরন্ত প্রাণচাঞ্চল্য ও অমলিন সারল্যের বার্তা।
প্রশ্ন: ৫৯. কবিতাটিতে মোট কয়টি চরণ বা পঙক্তি রয়েছে?
উত্তর: কবিতাটি মোট ১২টি
চরণে বিন্যস্ত।
প্রশ্ন: ৬০. 'তিনপাহাড়' ভৌগোলিকভাবে কোন অঞ্চলের অংশ?
উত্তর: ঝাড়খণ্ড বা ছোটনাগপুর
মালভূমি সংলগ্ন পাহাড়ি জনপদ।
প্রশ্ন: ৬১. কবিতাটির ছন্দ মূলত কোন রীতির?
উত্তর: সুরময় ও ধ্বনিপ্রধান
মাত্রাবৃত্ত ছন্দের রীতি।
প্রশ্ন: ৬২. কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় কোন বিশেষ কাব্য ধারার
সাথে জড়িয়ে ছিলেন?
উত্তর: হাংরি আন্দোলন ও
কৃত্তিবাসীয় আধুনিকতাবাদী কাব্যধারা।
প্রশ্ন: ৬৩. কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ কত খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত
হয়?
উত্তর: ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে।
প্রশ্ন: ৬৪. শক্তি চট্টোপাধ্যায় কোন কাব্যগ্রন্থের জন্য
'সাহিত্য অকাদেমি' পুরস্কারে ভূষিত হন?
উত্তর: 'যেতে পারি কিন্তু
কেন যাব' (১৯৮৩) কাব্যগ্রন্থের জন্য।
প্রশ্ন: ৬৫. কবিতায় মানবসত্তার সাথে প্রকৃতির সম্পর্ক
কেমন?
উত্তর: আত্মিক, নিবিড় ও
অহংকারহীন মিলনের সম্পর্ক।
প্রশ্ন: ৬৬. 'অন্ধকারে তিনপাহাড়ে ট্রেনের থেকে নেমে'—
চরণটিতে যাত্রীদের কোন মনোভাব প্রতিফলিত হয়?
উত্তর: শহর ছেড়ে দূর নিসর্গে
অভিযানের রোমাঞ্চকর মনোভাব।
প্রশ্ন: ৬৭. 'হাওয়াবিলাসী' শব্দটির ব্যাসবাক্য কী হবে?
উত্তর: হাওয়া বিলাস করে
যে (উপপদ তৎপুরুষ সমাস)।
প্রশ্ন: ৬৮. 'জনমানববিহীন' পদটির সমাস নির্ণয় করো।
উত্তর: জন ও মানব দ্বারা
বিহীন (তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস)।
প্রশ্ন: ৬৯. 'পথ হারিয়ে যায় যেদিকে, সেদিকে পথ আছেই'—
এই চরণের জীবনদর্শন কী?
উত্তর: প্রকৃতির কোলে কোনো
বাঁধাধরা নিয়ম নেই, স্বাধীনতার প্রতি পদক্ষেপে নতুন পথ রচিত হয়।
প্রশ্ন: ৭০. কবিতায় কোন সময়সীমার রূপান্তর ধরা পড়েছে?
উত্তর: গভীর রাতের অন্ধকার
থেকে ভোর ও সকালের আলো ফোটা পর্যন্ত।
প্রশ্ন: ৭১. রাতে নির্জন পাহাড়ি স্টেশনে পর্যটকদের মনে
কী অনুভূতি জাগে?
উত্তর: শহরের কৃত্রিম গণ্ডি
ভেঙে রোমাঞ্চ ও বিস্ময়ের অনুভূতি।
প্রশ্ন: ৭২. 'ঘুসুর ঘাসুর' শব্দবন্ধে কোন ইঙ্গিত লুকিয়ে
আছে?
উত্তর: মনের গভীর নিভৃতে
স্বপ্নের একান্ত সংলাপের ইঙ্গিত।
প্রশ্ন: ৭৩. 'আস্তে-ধীরে' শব্দযুগল কীসের দ্যোতক?
উত্তর: প্রকৃতির শান্ত,
স্নিগ্ধ ও স্বাভাবিক পরিবর্তনের দ্যোতক।
প্রশ্ন: ৭৪. 'গাঁ ভেসেছে তিনপাহাড়ের কোলে'— 'ভেসেছে' শব্দ
ব্যবহারের কারণ কী?
উত্তর: সকালের হালকা কুয়াশায়
পাহাড়ের কোল ঘেঁষা গ্রামটিকে স্বপ্নলোকের মতো ভাসমান মনে হওয়া।
প্রশ্ন: ৭৫. 'সহজ করে বাঁচা কি আর খাঁচাতে সম্ভব?'— বাক্যটির
অর্থগত রূপান্তর কী?
উত্তর: খাঁচাতে কোনোভাবেই
সহজ করে বাঁচা সম্ভব নয়।
প্রশ্ন: ৭৬. 'শিশুর কলবর' কোথায় অনুরণিত হয়?
উত্তর: তিনপাহাড়ের কোলে
অবস্থিত গ্রামীণ আঙিনায়।
প্রশ্ন: ৭৭. শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য
কী?
উত্তর: ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য,
জীবনের যন্ত্রণা ও প্রকৃতির বুকে পরম মুক্তির অন্বেষণ।
প্রশ্ন: ৭৮. 'কুয়োতলা' গ্রন্থটি কোন সাহিত্য প্রকরণের
অন্তর্ভুক্ত?
উত্তর: উপন্যাস।
প্রশ্ন: ৭৯. 'অবনী বাড়ি আছো?' কবিতাটি কোন কাব্যগ্রন্থের
অন্তর্গত?
উত্তর: কবির 'যেতে পারি
কিন্তু কেন যাব' কাব্যের অন্তর্ভুক্ত বিখ্যাত কবিতা।
প্রশ্ন: ৮০. শক্তি চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত 'কবিতা সাপ্তাহিকী'র
উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর: বাংলা কবিতার আধুনিক
রূপকে দ্রুত ও নিয়মিত পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
প্রশ্ন: ৮১. বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কোথায় অবস্থিত?
উত্তর: পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম
জেলার শান্তিনিকেতনে।
প্রশ্ন: ৮২. শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পিতা ও মাতার নাম কী
ছিল?
উত্তর: পিতা বামনদাস চট্টোপাধ্যায়
ও মাতা কমলাদেবী।
প্রশ্ন: ৮৩. 'নৈঃশব্দ্য' শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: শব্দহীনতা বা গভীর
নীরবতা।
প্রশ্ন: ৮৪. শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে বাংলা কবিতার ইতিহাসে
কী অভিধায় ভূষিত করা হয়?
উত্তর: আধুনিক বাংলা কবিতার
অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাণপুরুষ ও বোহেমিয়ান কবি।
প্রশ্ন: ৮৫. 'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতাটি কোন পাঠ্যসূচির
অন্তর্গত?
উত্তর: পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা
পর্ষদের মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যসূচির অন্তর্গত।
প্রশ্ন: ৮৬. 'ঝরনা' শব্দের দুটি সমার্থক শব্দ লেখো।
উত্তর: নির্ঝর, প্রস্রবণ।
প্রশ্ন: ৮৭. 'পাথর' শব্দের একটি তৎসম প্রতিশব্দ কী?
উত্তর: প্রস্তর বা শিলা।
প্রশ্ন: ৮৮. কবিতায় প্রাকৃতিক পটভূমির প্রধান রং কোনটি?
উত্তর: সবুজ।
প্রশ্ন: ৮৯. মানুষের তৈরি কৃত্রিম শৃঙ্খলকে কবিতায় কিসের
সাথে তুলনা করা হয়েছে?
উত্তর: 'খাঁচা'র সাথে।
প্রশ্ন: ৯০. 'ফ্রেম' শব্দটি কোন জাতীয় শব্দ?
উত্তর: ইংরেজি ভাষার আগন্তুক
শব্দ।
প্রশ্ন: ৯১. 'স্টেশন' শব্দটি কোন ভাষার শব্দ?
উত্তর: ইংরেজি শব্দ।
প্রশ্ন: ৯২. 'নকশিকাঁথা' বাঙালির কোন শিল্পের দ্যোতক?
উত্তর: চিরায়ত লোকশিল্প
ও সূচিকর্মের দ্যোতক।
প্রশ্ন: ৯৩. কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় কত বছর বয়সে প্রয়াত
হন?
উত্তর: মাত্র ৬১ বছর বয়সে।
প্রশ্ন: ৯৪. 'স্বপ্ন' শব্দটির উৎস কী?
উত্তর: তৎসম শব্দ।
প্রশ্ন: ৯৫. 'আঁধার' শব্দের বিপরীতার্থক শব্দ কী?
উত্তর: আলো বা আলোক।
প্রশ্ন: ৯৬. 'সহজ' শব্দের বিপরীতার্থক শব্দ কী?
উত্তর: জটিল বা কঠিন।
প্রশ্ন: ৯৭. 'তিনজোড়া চোখ' পঙক্তিতে কোন রূপকার্থ ফুটে
উঠেছে?
উত্তর: পর্যটকদের বিস্ময়
ও মুগ্ধতার দৃষ্টি।
প্রশ্ন: ৯৮. তিনপাহাড় স্টেশনটি রাতে কেমন ছিল?
উত্তর: সম্পূর্ণ জনশূন্য
ও তারায় আলোড়িত।
প্রশ্ন: ৯৯. 'মনোভূমির দহ' কোথায় অবস্থান করে?
উত্তর: মানুষের অন্তরাত্মার
সুপ্ত অনুভূতির গভীরে।
প্রশ্ন: ১০০. 'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতার মূল আবেদন কী?
উত্তর: যান্ত্রিক নগরের
খাঁচা ভেঙে অরণ্য-প্রকৃতির মুক্ত সারল্যে ফিরে যাওয়া।
|
বিভাগ খ: ৫০টি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক
প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৩) |
১. 'হাওয়াবিলাসী তিনজোড়া চোখ আটকে
গেল ফ্রেমে।'— তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উৎস ও প্রসঙ্গ: শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের
'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতার দ্বিতীয় চরণে এই উক্তিটি পাওয়া যায়।
ব্যাখ্যা: শহুরে নাগরিক জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে তিন বন্ধু রাতে তিনপাহাড় স্টেশনে নামেন।
চারপাশের নিস্তব্ধ পাহাড়ি প্রকৃতি ও তারাময় আকাশের অপরূপ সৌন্দর্য তাঁদের এতটাই মুগ্ধ
ও স্তম্ভিত করে যে তাঁদের দৃষ্টি যেন প্রকৃতির এক নিখুঁত ফ্রেমে চিরকালের জন্য বাঁধা
পড়ে যায়।
২. 'জনমানববিহীন স্টেশন, আকাশ ভরা
তারায়'— এই দৃশ্যপটের গুরুত্ব কী?
ব্যাখ্যা: এই চরণটিতে নির্জন
পাহাড়ি স্টেশনের এক মায়াবী পরিবেশ তুলে ধরা হয়েছে। কোলাহলমুক্ত শান্ত স্টেশনে কোনো
মানুষের উপস্থিতি নেই, মাথার ওপরে কেবল অগণিত তারার মেলা। এই দৃশ্য শহুরে কৃত্রিমতার
বিপরীতে আদিম ও নির্মল প্রাকৃতিক নিস্তব্ধতার বার্তা বহন করে এবং পর্যটকদের মনকে এক
রোমাঞ্চকর অনুভূতির মুখোমুখি দাঁড় করায়।
৩. 'এমন একটি দেশে আসলে সক্কলে পথ
হারায়।'— কেন সকলে পথ হারায়?
ব্যাখ্যা: এখানে 'পথ হারানো'
কোনো বিপদ বা বিভ্রান্তি নয়, বরং প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে দিশাহারা হয়ে আত্মবিস্মৃত
হওয়া। নগরজীবনের বাঁধাধরা ছক, সময় ও পথের নির্দিষ্ট নিয়ম তিনপাহাড়ের অরণ্যময় নিসর্গে
এসে অর্থহীন হয়ে পড়ে। মানুষ এখানে মুক্তির আনন্দে নিজের চেনা অহংকার ও হিসেবি সত্তা
হারিয়ে ফেলে।
৪. 'পথ হারিয়ে যায় যেদিকে, সেদিকে
পথ আছেই'— উক্তিটির অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝিয়ে দাও।
ব্যাখ্যা: কবি বোঝাতে চেয়েছেন
যে মুক্ত প্রকৃতির কোনো পূর্বনির্ধারিত রাস্তা থাকে না। প্রকৃতির মুক্ত প্রাঙ্গণে যেদিকেই
পা বাড়ানো যায়, সেদিকেই নতুন পথ ও সৌন্দর্য উন্মোচিত হয়। জীবনও যখন গণ্ডিমুক্ত হয়,
তখন যেকোনো অজানাই এক একটি নতুন সম্ভাবনার পথ হয়ে ওঠে।
৫. কবিতায় বর্ণিত পাহাড়ি নিসর্গের
উপাদানগুলি কী কী?
ব্যাখ্যা: কবি তিনপাহাড়ের
কোলে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির বাস্তব উপাদান হিসেবে তুলে ধরেছেন ঝরনা, কাঁদড় (ছোট নালা বা
খানাখন্দ), টিলা, অসমান পাথর এবং দিগন্তবিস্তৃত বনভূমি। এই সমস্ত উপাদান মিলে প্রকৃতিকে
একদিকে রুক্ষ-দৃঢ় এবং অন্যদিকে চিরহরিৎ ও সজীব করে তুলেছে।
৬. 'বনভূমির ওপারে কোন মনোভূমির দ'য়'—
'মনোভূমির দহ' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
ব্যাখ্যা: 'দহ' শব্দের অর্থ
নদীর অতল ঘূর্ণিজল বা গভীর গহ্বর। বহির্বিশ্বের নিবিড় বনভূমির মতোই মানুষের মনের মধ্যেও
রয়েছে এক সীমাহীন গহিন বিস্তার—কবি যাকে 'মনোভূমি' বলেছেন। বাইরের নিঃসীম প্রকৃতির
সাথে মানুষের অবচেতন মনের এই গূঢ় অতলান্ত তলদেশ একাত্ম হয়ে যায়।
৭. 'ফুসুর ফাসুর ঘুসুর ঘাসুর স্বপ্নে
কথা হয়!'— এই চরণের মধ্য দিয়ে কী প্রকাশিত হয়েছে?
ব্যাখ্যা: এটি কবির রোমান্টিক
কল্পনার এক অনন্য অভিব্যক্তি। পাহাড়ি রাতের গভীর নিস্তব্ধতায় পরিভ্রমণকারীদের মন যখন
অবচেতন ও স্বপ্নের রাজ্যে বিচরণ করে, তখন এক অদৃশ্য মৃদু ফিসফিসানি যেন প্রকৃতির সাথে
মনের গোপন সংলাপে মেতে ওঠে। দ্বিরুক্ত ধ্বন্যাত্মক শব্দগুলি সেই রহস্যময় স্বপ্নের আবহকে
জীবন্ত করে তোলে।
৮. 'পুব আকাশে আস্তে-ধীরে আলোর ঘোমটা
খোলে'— উপমাটি ব্যাখ্যা করো।
ব্যাখ্যা: কবি ভোরের সূর্যোদয়কে
লাজুক নববধূর ঘোমটা উন্মোচনের সাথে তুলনা করেছেন। পাহাড়ি অঞ্চলে সকালের আলো হুট করে
আসে না; কুয়াশা ভেদ করে ধীরে ধীরে রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ে। প্রকৃতির এই শান্ত, নম্র ও
শুভ্র জাগরণকে কবি 'ঘোমটা খোলা' রূপকের মাধ্যমে সার্থকভাবে রূপায়িত করেছেন।
৯. 'শক্ত সবুজ গাঁ ভেসেছে তিনপাহাড়ের
কোলে।'— গ্রামটিকে 'শক্ত সবুজ' বলা হয়েছে কেন?
ব্যাখ্যা: মালভূমি অঞ্চলের
ভৌগোলিক গঠন পাথুরে ও কঠিন, তাই মাটির স্বভাব শক্ত। কিন্তু সেই কঠিন পাথুরে বুক চিড়েই
গড়ে উঠেছে শ্যামল অরণ্য ও গ্রামীণ জনবসতি। রুক্ষ মাটির কাঠিন্য ('শক্ত') এবং প্রকৃতির
অফুরন্ত সজীবতা ('সবুজ')—উভয়ের অপরূপ সমন্বয়ে গ্রামটি গড়ে উঠেছে বলেই কবি এমন বিশেষণে
ভূষিত করেছেন।
১০. 'সহজ করে বাঁচা কি আর খাঁচাতে
সম্ভব?'— কবির এই প্রশ্নের কারণ কী?
ব্যাখ্যা: এখানে 'খাঁচা'
হলো নাগরিক যান্ত্রিক সভ্যতা, স্বার্থপরতা ও ইট-কাঠের বন্দিদশার প্রতীক। সেখানে নিয়মকানুনের
জাঁতাকলে মানুষের সহজ-সরল স্বাভাবিক বেঁচে থাকার আনন্দ হারিয়ে যায়। খাঁচার ভেতর কৃত্রিম
অস্তিত্ব টিকে থাকতে পারে, কিন্তু মুক্ত মনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণস্পন্দন কেবল অরণ্য-প্রকৃতির
বুকেই সম্ভব।
১১. 'তিনপাহাড়ের নকশিকাঁথায় শিশুর
কলবর।'— শেষ চরণের তাৎপর্য কী?
ব্যাখ্যা: নকশিকাঁথা বাংলার
গ্রামীণ ঐতিহ্যের স্নেহ ও শিল্পময়তার প্রতীক। পাহাড়, জঙ্গল আর মাটির মেঠো আলপথ মিলে
তিনপাহাড়ের গ্রামটি যেন এক বিশাল নকশিকাঁথা। সেই শান্ত স্নিগ্ধ পটে শিশুর উচ্ছ্বল কলবর
এক নির্মল ভবিষ্যতের প্রাণময় আশাবাদ ছড়িয়ে দিয়ে কবিতাকে পূর্ণতা দেয়।
১২. কবি হিসেবে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের
আধুনিকতাবাদী পরিচয় সংক্ষেপে লেখো।
ব্যাখ্যা: শক্তি চট্টোপাধ্যায়
(১৯৩৩-১৯৯৫) আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। ষাটের দশকের 'কৃত্তিবাস'
পত্রিকার সাথে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। চিরাচরিত আবেগ বর্জন করে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য,
জীবনের তীব্র নৈরাশ্য ও প্রকৃতির প্রতি দুর্নিবার রোমান্টিক টানের দ্বন্দ্বে তাঁর কবিতা
অভিনব রূপ লাভ করেছে।
১৩. শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের উল্লেখযোগ্য
কাব্যগ্রন্থগুলির নাম উল্লেখ করো।
ব্যাখ্যা: তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ
'হে প্রেম, হে নৈঃশব্দ্য' (১৯৬১)। এছাড়াও উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে—'ধর্মে
আছি জিরাফেও আছি', 'হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান', 'সোনার মাছি খুন করেছি', 'যেতে
পারি কিন্তু কেন যাব' ইত্যাদি। তাঁর মোট কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৫১টি।
১৪. ঔপন্যাসিক হিসেবে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের
কৃতিত্ব কী?
ব্যাখ্যা: মূলত শীর্ষস্থানীয়
কবি হলেও কথাসাহিত্যে তাঁর সৃষ্টি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। তাঁর রচিত বিখ্যাত
দুটি উপন্যাস হলো 'কুয়োতলা' ও 'অবনী বাড়ি আছো?'। কাব্যিক ভাষা, অন্তর্মুখী চরিত্রায়ণ
ও জীবনের জটিল বাস্তবতার সংমিশ্রণে তাঁর উপন্যাসগুলি বাংলা সাহিত্যে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
১৫. শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রাপ্ত
প্রধান সাহিত্য পুরস্কারগুলির পরিচয় দাও।
ব্যাখ্যা: শক্তি চট্টোপাধ্যায়
বাংলা সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য বহু সম্মানে ভূষিত হন। তিনি লাভ করেছেন ঐতিহ্যবাহী
'আনন্দ পুরস্কার', রবীন্দ্রভারতী বা রাজ্য সরকারের 'রবীন্দ্র পুরস্কার' এবং ১৯৮৩ সালে
'যেতে পারি কিন্তু কেন যাব' কাব্যগ্রন্থের জন্য ভারতের সর্বোচ্চ সম্মান 'সাহিত্য অকাদেমি'
পুরস্কার।
১৬. 'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতাটির নামকরণের
সার্থকতা বিচার করো।
ব্যাখ্যা: কবিতাটির সমগ্র
পটভূমি আবর্তিত হয়েছে তিনপাহাড় স্টেশনে নামা থেকে শুরু করে ভোরের আলোয় সেই পাহাড়ি উপত্যকার
গ্রাম ও প্রকৃতিকে প্রত্যক্ষ করার মধ্য দিয়ে। স্থানটির নৈসর্গিক রূপ, নির্জনতা এবং
গ্রামীণ শিশুর কলবর সবই 'তিনপাহাড়ের কোলে' আশ্রয় পেয়েছে। তাই এই স্থাননামিক ও ভাবানুষঙ্গিক
নামকরণটি সর্বতোভাবে সার্থক।
১৭. কবিতায় রাত্রিকালীন পরিবেশের যে
রূপ ধরা পড়েছে তা সংক্ষেপে বর্ণনা করো।
ব্যাখ্যা: রাত্রিকালীন তিনপাহাড়
স্টেশনটি সম্পূর্ণ জনমানবশূন্য, শান্ত ও নির্জন। মাথার উপরে উন্মুক্ত আকাশ তারার দ্যুতিতে
ঝলমল করছে। দূরে অন্ধকার অরণ্যের বিস্তার এবং নিস্তব্ধতার মধ্যে এক ধরনের অলৌকিক মোহময়তা
পর্যটকদের মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।
১৮. 'হাওয়াবিলাসী' শব্দটির মধ্যে কোন
মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে?
ব্যাখ্যা: 'হাওয়া বিলাসী'
কথাটি ইতিবাচক ব্যঞ্জনায় ব্যবহৃত। শহরের মানুষ যখন কাজের ক্লান্তি ও সংকীর্ণতা থেকে
মুক্তি পেতে একটু তাজা হাওয়া ও সৌন্দর্যের সন্ধানে ভ্রমণে বের হয়, তখন তারা হয়ে ওঠে
হাওয়া বিলাসী। প্রকৃতির মুক্ত সান্নিধ্য উপভোগ করাই এই অভিযাত্রীদের মূল অভিপ্রায়।
১৯. 'দহ' এবং 'মনোভূমি' শব্দ দুটি
ব্যবহারের উপযোগিতা কী?
ব্যাখ্যা: 'দহ' শব্দের অর্থ
অতল জলের ঘূর্ণি এবং 'মনোভূমি' হলো মনোজগৎ। প্রকৃতির বাহ্যিক বিস্তারের মতোই মানুষের
মনের গভীরতাও অতলস্পর্শী। পাহাড়ের নির্জনতায় অবচেতন মন যখন জাগ্রত হয়, তখন মনের গভীর
অতলে অনুভূতির আলোড়ন তৈরি হয়—কবি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তা ফুটিয়ে তুলেছেন।
২০. 'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতায় বাস্তব
ও কল্পনার মেলবন্ধন কীভাবে ঘটেছে?
ব্যাখ্যা: কবিতাটিতে ট্রেন,
স্টেশন, পাথর, টিলা, ঝরনা ও গ্রামের দৃশ্য যেমন প্রত্যক্ষ বাস্তবের প্রতিফলন, তেমনই
'মনোভূমির দহ' ও 'স্বপ্নে কথা হওয়া' গভীর রোমান্টিক কল্পনার প্রকাশ। বাস্তব প্রাকৃতিক
অভিজ্ঞতার ওপর ভর করেই কবি আধ্যাত্মিক ও মানসিক মুক্তির এক পরাবাস্তব স্বপ্নলোক গড়ে
তুলেছেন।
২১. কবিতায় 'নকশিকাঁথা' উপমাটি ব্যবহারের
নান্দনিক তাৎপর্য কী?
ব্যাখ্যা: নকশিকাঁথায় যেমন
নানা রঙের সুতো দিয়ে গ্রামের মা-বোনেরা মমতাভরে জীবনের গল্প বুনে তোলেন, তেমনই তিনপাহাড়ের
পাহাড়, সবুজ বন, ঝরনা ও লাল মাটির আলপথ মিলে প্রকৃতি যেন এক বিশাল শিল্পকর্ম তৈরি করেছে।
এটি মাটির গন্ধমাখা ঐতিহ্যের সাথে প্রকৃতিকে একীভূত করে।
২২. 'খাঁচা' ও 'মুক্ত প্রকৃতি'র বৈপরীত্য
কবিতায় কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে?
ব্যাখ্যা: কবি 'খাঁচা' বলতে
নাগরিক জীবনের কৃত্রিম বন্ধন, অহমিকা ও একঘেয়ে যান্ত্রিকতাকে বুঝিয়েছেন যেখানে প্রাণের
বিকাশ রুদ্ধ। অপরদিকে তিনপাহাড়ের অরণ্য, অবাধ পথ ও শিশুর কলবর হলো অনন্ত মুক্তির প্রতীক।
এই দুই বিপরীত চিত্রের মাধ্যমে মুক্তির জয়গান গাওয়া হয়েছে।
২৩. বিশ্বভারতীর সাথে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের
সম্পর্ক কীরূপ ছিল?
ব্যাখ্যা: শক্তি চট্টোপাধ্যায়
তাঁর জীবনের শেষ পর্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে
'অতিথি অধ্যাপক' (Guest Professor) হিসেবে অধ্যাপনায় নিযুক্ত ছিলেন। সেখানেই অধ্যাপনারত
অবস্থায় ১৯৯৫ সালের ২৩শে মার্চ আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ
করেন।
২৪. 'কবিতা সাপ্তাহিকী' ও 'কৃত্তিবাস'
পত্রিকার সাথে কবির সংযোগ ব্যাখ্যা করো।
ব্যাখ্যা: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
প্রবর্তিত বিখ্যাত 'কৃত্তিবাস' পত্রিকার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়,
যা বাংলা আধুনিক কবিতার ভাব ও আঙ্গিক বদলে দিয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি নিজেই একক উদ্যোগে
'কবিতা সাপ্তাহিকী' নামক অভিনব সংকলন প্রকাশ করে সাহিত্যমহলে তীব্র আলোড়ন তোলেন।
২৫. 'অন্ধকারে তিনপাহাড়ে ট্রেনের থেকে
নেমে'— ভ্রমণবৃত্তান্তের সূচনা হিসেবে পঙক্তিটি কতটা কার্যকরী?
ব্যাখ্যা: এই প্রথম চরণের
মধ্য দিয়েই কবি পাঠককে সরাসরি নাগরিক কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক অদেখা পাহাড়ি নির্জনতার
মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন। রাতের অন্ধকারের পটভূমি পরবর্তী মায়াবী দৃশ্য ও সূর্যোদয়ের
রূপান্তরের জন্য নিখুঁত ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।
২৬. 'তিনজোড়া চোখ' পঙক্তিতে সংখ্যার
প্রয়োগ কীভাবে বিশেষ মাত্রা পেয়েছে?
ব্যাখ্যা: তিনজোড়া চোখ অর্থাৎ
তিনজন সহযাত্রী। তিনপাহাড় নামের ভৌগোলিক সংখ্যার সাথে তিনজোড়া চোখের এই সাদৃশ্য এক
চমৎকার ছন্দ ও রূপক তৈরি করে। বন্ধুদের সমবেত দৃষ্টি ও সম্মিলিত বিস্ময় পুরো নিসর্গদৃশ্যকে
এক আনন্দময় অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করে।
২৭. কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক
শিক্ষা সম্পর্কে যা জানো লেখো।
ব্যাখ্যা: তিনি কলকাতার
ঐতিহ্যবাহী প্রেসিডেন্সি কলেজে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে
নবগঠিত তুলনামূলক সাহিত্য (Comparative Literature) বিভাগে ভর্তি হন, যদিও বোহেমিয়ান
জীবনের কারণে সেই অধ্যয়ন অসমাপ্ত থেকে যায়। পরবর্তীতে স্বীয় প্রতিভায় তিনি বাংলা সাহিত্যের
দিকপাল হয়ে ওঠেন।
২৮. 'যম' কবিতাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব
কী?
ব্যাখ্যা: কবি বুদ্ধদেব
বসু সম্পাদিত অগ্রণী সাহিত্যপত্রিকা 'কবিতা'য় শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'যম' কবিতাটি প্রকাশের
মধ্য দিয়ে তাঁর আনুষ্ঠানিক কাব্যযাত্রার সূচনা হয়। এই কবিতার মাধ্যমে বুদ্ধদেব বসু
স্বয়ং তরুণ শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মৌলিক কবিত্বশক্তিকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
২৯. তিনপাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ কীভাবে
মানুষের মনের মুক্তি ঘটায়?
ব্যাখ্যা: শহরের সীমাবদ্ধ
গণ্ডি থেকে মুক্ত হয়ে যখন মানুষ পাহাড়ি খোলা আকাশ, তারা, বনভূমি ও নির্জনতার সান্নিধ্যে
আসে, তখন মনের সমস্ত কৃত্রিম সংকীর্ণতা মুছে যায়। পথ হারানোর আনন্দ মানুষকে প্রকৃতির
সাথে গভীর আত্মিক মিলনে লীন করে দেয়।
৩০. 'স্বপ্নে কথা হয়'— স্বপ্নের এই
অনুভূতি কোন মানসিক অনুভূতির সাথে তুলনীয়?
ব্যাখ্যা: যখন মানুষ প্রকৃতির
নির্মল সৌন্দর্যে সম্পূর্ণভাবে সমর্পিত হয়, তখন তার সচেতন যুক্তিবাদী মন স্তব্ধ হয়ে
যায়। অবচেতন মন তখন আদিম ও অকৃত্রিম আনন্দলোকের সাথে এক গোপন আত্মীয়তায় জড়িয়ে পড়ে,
যাকে কবি স্বপ্নের রূপক দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন।
৩১. 'আলোর ঘোমটা খোলে'— চরণটিতে ভোরের
চিত্রায়ণে কোন মানবিক গুণ আরোপিত হয়েছে?
ব্যাখ্যা: এখানে জড় প্রকৃতির
ওপর সচেতন মানবসত্তার অনুভূতি বা পার্সোনিফিকেশন (Personification) আরোপিত হয়েছে। ভোরের
আলোর আগমনকে লাজুক তরুণীর ধীরে ধীরে ঘোমটা উন্মোচন করার স্নিগ্ধ লাবণ্যের সাথে তুলনা
করে কবি দৃশ্যটিকে জীবন্ত করে তুলেছেন।
৩২. 'শক্ত সবুজ গাঁ' কথাটিতে বৈপরীত্যের
সৌন্দর্য কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে?
ব্যাখ্যা: 'শক্ত' শব্দটি
রুক্ষতা ও পাথুরে দৃঢ়তার প্রতীক, আর 'সবুজ' হলো কমনীয়তা, প্রাণ ও কোমলতার প্রতীক। বাহ্যত
দুটি পরস্পরবিরোধী হলেও তিনপাহাড়ের রুক্ষ ভূমিতে অরণ্যের যে নিবিড় সহাবস্থান, এই শব্দযুগলে
সেই দুর্লভ প্রাকৃতিক ভারসাম্যটি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।
৩৩. 'সহজ করে বাঁচা' বলতে কবি প্রকৃতপক্ষে
কী বুঝিয়েছেন?
ব্যাখ্যা: কোনো প্রকার ভণিতা,
কৃত্রিম সামাজিক মুখোশ, প্রতিযোগিতা ও যান্ত্রিক দাসত্ব ছাড়া প্রকৃতির নিয়মে আনন্দ
নিয়ে বাঁচাই হলো 'সহজ করে বাঁচা'। আদিবাসী বা গ্রামীণ শিশুদের সারল্যভরা জীবনই এই সহজ
বাঁচার আদর্শ রূপ।
৩৪. কবিতার শেষে শিশুর কলরবকে নিয়ে
আসার প্রাসঙ্গিকতা কী?
ব্যাখ্যা: শিশু হলো নিষ্পাপতা
ও নবপ্রাণের প্রতীক। অন্ধকার রাত ও ভোরের নির্জনতার পর যখন লোকালয়ে শিশুর কণ্ঠের কলরব
শোনা যায়, তখন কবিতাটি এক গভীর জীবনমুখী আশাবাদে মুখরিত হয়ে ওঠে—যেখানে মানুষ ও প্রকৃতি
মিলেমিশে বাস করে।
৩৫. শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কাব্যে অরণ্য
ও প্রকৃতির ভূমিকা কেমন ছিল?
ব্যাখ্যা: শক্তি চট্টোপাধ্যায়
ছিলেন চিরকালের অরণ্যপ্রেমী কবি। শহর ও নাগরিক জীবনকে তিনি খাঁচার মতো দেখতেন এবং বারবার
ছুটে যেতেন চাইবাসা, ঘাটশিলা বা ডুয়ার্সের নিবিড় অরণ্যে। তাঁর কাব্যে প্রকৃতি কেবল
দৃশ্যপট নয়, তা আত্মিক মুক্তির চিরন্তন আশ্রয়।
৩৬. 'হে প্রেম, হে নৈঃশব্দ্য' কাব্যগ্রন্থের
নামকরণের তাৎপর্য কী?
ব্যাখ্যা: শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের
প্রথম কাব্যগ্রন্থের এই নামটিতেই তাঁর কবিমানসের মূল দ্বৈততা ধরা পড়ে। একদিকে জীবনের
প্রতি তীব্র ভালোবাসা ও প্রেম, অন্যদিকে গভীর একাকীত্ব ও অন্তহীন নৈঃশব্দ্যের খোঁজ—এই
দুই ধারাই তাঁর সমগ্র কাব্যের ভিত্তি।
৩৭. 'পথ হারিয়ে যায় যেদিকে, সেদিকে
পথ আছেই'— বাক্যটিতে ব্যাকরণগত ও ভাবগত সৌন্দর্য কী?
ব্যাখ্যা: আপাতদৃষ্টিতে
বাক্যটি একটি বিরোধাভাস (Paradox), কারণ পথ হারালে তো চলার উপায় থাকার কথা নয়। কিন্তু
ভাবগত অর্থে কবি দেখিয়েছেন যে প্রকৃতির মুক্ত অঙ্গনে কোনো নির্দিষ্ট বাঁধাধরা পথ না
থাকলেও সর্বত্রই বিচরণের স্বাধীনতা ও নতুন সৃষ্টির আনন্দ লুকিয়ে থাকে।
৩৮. 'কাঁদড়' শব্দটি ব্যবহারের আঞ্চলিক
বিশিষ্টতা বুঝিয়ে দাও।
ব্যাখ্যা: 'কাঁদড়' রাঢ় বাংলা
তথা ছোটনাগপুর সংলগ্ন অঞ্চলের একটি দেশজ শব্দ, যার অর্থ পাহাড়ি গভীর নালা বা জলস্রোতের
খাত। এই আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগে কবিতার স্থানীয় ভৌগোলিক রূপ ও মাটির সোঁদা গন্ধ অত্যন্ত
সার্থকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
৩৯. কবিতার ভাষা ও ছন্দ কতটা শিশুবান্ধব
ও সার্বজনীন?
ব্যাখ্যা: অতি সহজ-সরল পদাবলি,
'ফুসুর ফাসুর ঘুসুর ঘাসুর' জাতীয় ধ্বন্যাত্মক শব্দের ব্যবহার এবং ছন্দোবদ্ধ অন্ত্যমিল
কবিতাটিকে যেমন কিশোর-কিশোরীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে, তেমনই এর ভেতরের গভীর জীবনদর্শন
বড়দেরও ভাবিয়ে তোলে।
৪০. 'তিনপাহাড়' শব্দটির তাৎপর্য কবিতায়
কীভাবে ধরা পড়েছে?
ব্যাখ্যা: তিনপাহাড় কেবল
একটি রেল স্টেশন নয়, এটি নাগরিক কোলাহল থেকে বহুদূরে অবস্থিত এক প্রশান্ত আশ্রয়। তিন
পাহাড়ের সম্মিলিত রূপ যেন এক প্রাকৃতিক দুর্গের মতো শান্ত গ্রামটিকে সব কৃত্রিমতার
হাত থেকে আগলে রেখেছে।
৪১. শক্তি চট্টোপাধ্যায় রচিত 'অবনী
বাড়ি আছো?' উপন্যাসের মূল উপজীব্য কী?
ব্যাখ্যা: তাঁর এই বিখ্যাত
রচনা মূলত আধুনিক মানুষের একাকীত্ব, অনিশ্চয়তা এবং গৃহহীন আত্মিক সংকটের এক গভীর রূপায়ণ।
দরজায় কড়া নেড়ে আত্মাকে জাগিয়ে তোলার যে আকুল আর্তি তাঁর কবিতায় ছিল, উপন্যাসেও সেই
নাগরিক অস্তিত্বের সংকট বিস্তার লাভ করেছে।
৪২. 'যেতে পারি কিন্তু কেন যাব'— এই
পঙক্তি বা গ্রন্থের মূল দর্শন কী?
ব্যাখ্যা: মানুষের জীবন
স্বেচ্ছায় ধ্বংসের অতলে চলে যেতে পারে, কিন্তু জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা ও ভালোবাসাই
মানুষকে শেষপর্যন্ত টিকিয়ে রাখে। নৈরাশ্য ও মৃত্যুর টান সত্ত্বেও জীবনের কাছে ফিরে
আসার এই সংকল্প শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিপ্রতিভার অন্যতম শিখর।
৪৩. 'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতায় বর্ণিত
আলো-আঁধারির খেলাটি বিশ্লেষণ করো।
ব্যাখ্যা: কবিতাটি শুরু
হয় রাতের গভীর অন্ধকারে তারার আলো দিয়ে এবং শেষ হয় ভোরের স্নিগ্ধ আলোর ঘোমটা খুলে শক্ত
সবুজ গ্রামের জেগে ওঠার মাধ্যমে। অন্ধকার থেকে আলোর এই উত্তরণ মূলত নাগরিক হতাশা থেকে
প্রকৃতির আলোকোজ্জ্বল মুক্তিতে উত্তরণের প্রতীক।
৪৪. পর্যটকদের চোখ কেন প্রকৃতির ফ্রেমে
আটকে যায়?
ব্যাখ্যা: শহরের নাগরিক
জীবনে মানুষ দেখে কৃত্রিম অট্টালিকা আর ধোঁয়াশার বিস্তার। কিন্তু তিনপাহাড়ের জনহীন
স্টেশনে নেমে যখন তারা তারাময় আকাশ ও পাহাড়ের নিস্তব্ধ রূপ দেখে, তখন সেই অপার্থিব
সৌন্দর্যের আকর্ষণে তাদের চোখ মুগ্ধতায় নিস্পন্দ হয়ে ফ্রেমে বাঁধা ছবির মতো আটকে যায়।
৪৫. 'নকশিকাঁথা'র রূপকটি গ্রামীণ পরিবেশের
সাথে কীভাবে মানানসই?
ব্যাখ্যা: বিভিন্ন রঙের
কাপড়ের টুকরো ও সুতোর নিখুঁত বুননে যেমন নকশিকাঁথা সমৃদ্ধ হয়, তেমনই তিনপাহাড়ের লাল
মাটি, পাথুরে জমি, সবুজ বন এবং সহজ-সরল মানুষের জীবন মিলেমিশে প্রকৃতির বুকে এক অপূর্ব
নান্দনিক নকশা তৈরি করেছে।
৪৬. কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জীবনবোধে
বোহেমিয়ান মানসিকতার ছাপ কীভাবে পাওয়া যায়?
ব্যাখ্যা: প্রচলিত সামাজিক
নিয়মের বাঁধন ভেঙে মুক্ত হাওয়ার মতো ঘুরে বেড়ানো, ছকভাঙা জীবনযাপন এবং প্রকৃতির নির্জনতায়
বারবার আশ্রয় খোঁজা ছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সহজাত বৈশিষ্ট্য। তাঁর এই বোহেমিয়ান বা
বাঁধনহারা রূপই কবিতায় 'খাঁচা'র বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয়ে উঠেছে।
৪৭. মাধ্যমিক পরীক্ষার উপযোগী করে
'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতার কেন্দ্রীয় বার্তা কী হতে পারে?
ব্যাখ্যা: নাগরিক জীবনের
যান্ত্রিকতা ও কৃত্রিম অহংকার পরিত্যাগ করে প্রকৃতির উন্মুক্ত সৌন্দর্যে অবগাহন করা
এবং গ্রামবাংলার সহজ-সরল শিশুসুলভ সারল্যে জীবনকে উপভোগ করাই এই কবিতার প্রধান ও শিক্ষণীয়
বার্তা।
৪৮. 'দহ' শব্দটির আলঙ্কারিক প্রয়োগ
সংক্ষেপে বুঝিয়ে দাও।
ব্যাখ্যা: সাধারণ অর্থে
'দহ' হলো নদী বা খালের গভীর জলপূর্ণ ঘূর্ণি। কিন্তু কবি একে যুক্ত করেছেন 'মনোভূমি'র
সাথে। এর ফলে তা রূপক অলঙ্কারে পরিণত হয়ে মানুষের অবচেতন মনের অতলান্ত রহস্য ও আবেগের
গভীরতাকে নির্দেশ করেছে।
৪৯. কবিতাটিতে প্রকৃতির প্রতি কবির
দৃষ্টিভঙ্গি কেমন?
ব্যাখ্যা: কবির কাছে প্রকৃতি
কেবল দূর থেকে দেখার কোনো জড় বস্তু নয়; প্রকৃতি এক পরম সজীব, আশ্রয়দাত্রী ও প্রাণদাত্রী
সত্তা—যা মানুষের ক্লান্ত আত্মাকে শান্ত করে এবং খাঁচামুক্ত জীবনের আনন্দ আস্বাদন করায়।
৫০. পাঠ্য হিসেবে 'তিনপাহাড়ের কোলে'
কবিতাটির উপযোগিতা সংক্ষেপে লেখো।
ব্যাখ্যা: কবিতাটি শিক্ষার্থীদের
পরিবেশপ্রেমী করে তোলে, রুক্ষ কৃত্রিম জীবনের পরিবর্তে প্রকৃতির সজীবতার গুরুত্ব বোঝায়
এবং ছন্দ ও রূপকময় আধুনিক বাংলা কবিতার রসাস্বাদনে এক অতুলনীয় ভূমিকা পালন করে।
|
বিভাগ গ: ২০টি বিশ্লেষণধর্মী ও বড় প্রশ্ন
ও উত্তর (মান: ৫) |
১. 'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতার মূল বিষয়বস্তু
ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য নিজের ভাষায় আলোচনা করো।
উত্তর:
ভূমিকা: আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ও জনপ্রিয় কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের
লেখা 'তিনপাহাড়ের কোলে' একটি অসাধারণ নিসর্গচেতনা ও মুক্তিকামী ভাবনার কবিতা।
বিষয়বস্তু:
১. রাত্রিকালীন আগমন: তিন বন্ধু নাগরিক জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে ট্রেনের
থেকে নামেন জনমানববিহীন তিনপাহাড় স্টেশনে। গভীর রাতের অন্ধকার হলেও আকাশ ভরা ছিল উজ্জ্বল
তারায়, যা দেখে শহরের পর্যটকদের চোখ মুগ্ধতায় স্থির হয়ে যায়।
২. প্রকৃতির মায়াবী বিস্তার: এমন মুক্ত দেশে এলে স্বাভাবিকভাবেই পথ হারিয়ে যায়। কিন্তু
সে পথ হারানো কোনো বিভ্রান্তি নয়; কারণ প্রকৃতির বুকে যেদিকেই তাকানো যায়, সেদিকেই
ঝরনা, কাঁদড়, টিলা আর পাথরের সান্নিধ্যে নতুন পথ উন্মোচিত হয়।
৩. মনোভূমি ও স্বপ্নদর্শন: বনভূমির ওপারে মানুষের অন্তর্জগতের 'মনোভূমির দহ' জেগে ওঠে
এবং প্রকৃতির সাথে এক গোপন অবচেতন সংলাপে মেতে ওঠে পর্যটকদের হৃদয়।
৪. ভোরের আগমন ও নবজীবন: ধীরে ধীরে পুব আকাশে আলোর ঘোমটা খোলে। পাহাড়ি উপত্যকার কোলে
কুয়াশা আর রোদে ভেসে ওঠে 'শক্ত সবুজ গাঁ'।
৫. মুক্তির বার্তা: কবি অনুভব করেন যে শহরের খাঁচায় সহজ-স্বাভাবিক জীবন অসম্ভব। শেষপর্যন্ত
তিনপাহাড়ের নকশিকাঁথার মতো সুন্দর পরিবেশে শিশুর প্রাণবন্ত কলরব মানুষের আদিম ও মুক্ত
জীবনের জয়গান ঘোষণা করে।
তাৎপর্য: কবিতাটি ইট-কাঠের যান্ত্রিক নগরের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে প্রকৃতির স্নিগ্ধ
কোলে ফিরে যাওয়ার এক চিরন্তন মানবিক আর্তি।
২. 'সহজ করে বাঁচা কি আর খাঁচাতে সম্ভব?
/ তিনপাহাড়ের নকশিকাঁথায় শিশুর কলবর।'— তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
উত্তর:
উৎস: উদ্ধৃত পঙক্তি দুটি কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতার অন্তিম
অংশ থেকে গৃহীত হয়েছে।
খাঁচার তাৎপর্য:
কবি এখানে 'খাঁচা' বলতে আধুনিক নাগরিক জীবনকে বুঝিয়েছেন। শহরের চারদেওয়ালের বন্দিত্ব,
কৃত্রিম সামাজিক প্রত্যাশা, নিয়মের কড়াকড়ি এবং স্বার্থপর প্রতিযোগিতা মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে
বেঁধে রাখে। সেখানে প্রাণ আছে কিন্তু প্রাণের স্বাভাবিক স্ফূর্তি নেই; বেঁচে থাকা সেখানে
এক ক্লান্তিকর যান্ত্রিকতা মাত্র।
সহজ করে বাঁচার অন্বেষণ:
সহজ জীবন হলো প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে সরল, অহংকারহীন ও নির্ভার হয়ে বেঁচে থাকা। কবি
প্রশ্ন তুলেছেন—যেখানে মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপে শৃঙ্খল, সেখানে কি সহজ জীবন সম্ভব?
উত্তরটি সংশয়হীনভাবে 'না'।
নকশিকাঁথা ও শিশুর কলবর:
নাগরিক খাঁচার সম্পূর্ণ বিপরীত রূপ হলো তিনপাহাড়ের প্রাকৃতিক উপত্যকা। পাহাড়, বনানী,
নদী ও মেঠো পথ মিলে প্রকৃতি যেন এক মমতাময় 'নকশিকাঁথা' তৈরি করেছে। আর সেই শান্ত স্নিগ্ধ
প্রান্তরে বেজে ওঠে গ্রামীণ শিশুর নিষ্পাপ ও মুক্ত কলরব। শিশু কোনো কৃত্রিম নিয়ম মানে
না; তার হাসি ও খেলাই প্রকৃত জীবনের সার্থকতা। এই দুটি চরণের মধ্য দিয়ে কবি নগরসভ্যতার
অসারতা দূর করে প্রকৃতির মুক্ত সারল্যে আত্মনিবেদনের চিরন্তন বার্তা দিয়েছেন।
৩. 'অন্ধকারে তিনপাহাড়ে ট্রেনের থেকে নেমে,
/ হাওয়াবিলাসী তিনজোড়া চোখ আটকে গেল ফ্রেমে।'— দৃশ্যটির রূপসৌন্দর্য ও অন্তর্নিহিত
ভাব আলোচনা করো।
উত্তর:
প্রসঙ্গ ও দৃশ্যপট:
শহরের কোলাহল ও যান্ত্রিক ব্যস্ততা থেকে রেহাই পাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনজন বন্ধু রাতের
ট্রেনে চড়ে নির্জন তিনপাহাড় স্টেশনে পদার্পণ করেন। কবি তাঁদের পরিচয় দিয়েছেন 'হাওয়াবিলাসী'
হিসেবে, অর্থাৎ তাঁরা এসেছেন প্রকৃতির নির্মল সমীরণ ও সৌন্দর্য উপভোগ করতে।
সৌন্দর্যের মোহময়তা ('আটকে গেল ফ্রেমে'):
স্টেশনে নেমে তাঁরা যে দৃশ্যের সম্মুখীন হন, তা কোনো সাধারণ দৃশ্য নয়। চারদিক নীরব,
স্টেশন সম্পূর্ণ নির্জন এবং মাথার ওপর আকাশভরা তারার দ্যুতি। শহরের ধোঁয়াশাচ্ছন্ন আকাশে
তারা দেখা যায় না; কিন্তু এখানে প্রকৃতি যেন তাঁর সম্পূর্ণ অলঙ্কার নিয়ে উপস্থিত। এই
অভাবনীয় ও আদিম রূপ দেখে তাঁদের বিস্ময়বিস্ফোরিত চোখ যেন কোনো এক নিখুঁত ফ্রেমে আঁকা
ছবির মতো নিস্পন্দ হয়ে গেল।
ভাবার্থ ও গুরুত্ব:
১. দৃষ্টির রূপান্তর: নাগরিক মানুষের সংকীর্ণ দৃষ্টি প্রথম দর্শনেই প্রকৃতির মহিমার
কাছে নতজানু হয়।
২. নিঃশব্দতার আবেদন: স্টেশনে কোনো কোলাহল নেই, কেবল প্রকৃতি ও মানুষের আত্মিক সংযোগ।
৩. কাব্যিক সূত্রপাত: এই প্রথম দুটি চরণের মাধ্যমেই কবি গভীর নগরজীবন ও অরণ্য-প্রকৃতির
মধ্যে এক সুস্পষ্ট ভেদরেখা টেনে দেন এবং পাঠককে এক রোমাঞ্চকর ভাবজগতে প্রবেশ করান।
৪. 'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতায় পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি
ও নিসর্গচিত্রের নিখুঁত বিবরণ দাও।
উত্তর:
ভূমিকা: কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় অরণ্য ও পাহাড়ের রূপকার। 'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতায়
তিনি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত পরিসরে ঝাড়খণ্ড বা ছোটনাগপুর মালভূমির বৈশিষ্ট্যপূর্ণ প্রাকৃতিক
পরিবেশ নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির উপাদানসমূহ:
১. নির্জন স্টেশন ও তারাময় আকাশ: জনহীন প্ল্যাটফর্ম এবং দূষণমুক্ত রাতের আকাশে অগণিত
তারার মেলা পাহাড়ি পরিবেশের আদিম ও শান্ত রূপকে স্পষ্ট করে।
২. রুক্ষ ও বন্ধুর বন্ধুরূপ: কবি উল্লেখ করেছেন 'ঝরনা, কাঁদড়, টিলা, পাথর'—যা স্পষ্টতই
মালভূমি বা পাহাড়ি অঞ্চলের ভূপ্রাকৃতিক পরিচয়। পাথুরে অসমতল জমি, মাটির ছোট ছোট টিলা
এবং পাহাড়ি খানাখন্দ বা নালা ('কাঁদড়') এই অঞ্চলের চিরপরিচিত দৃশ্য।
৩. দিগন্তবিস্তৃত বনভূমি: পাথুরে কাঠিন্যের পাশে রয়েছে ঘন সবুজ বনভূমি। এই বনানী বহির্বিশ্ব
থেকে লোকালয়কে এক রহস্যময় আবহে আলাদা করে রেখেছে।
৪. ভোরের আলো ও ভাসমান গ্রাম: রাতের অন্ধকার কেটে যখন পুব আকাশে ধীরে ধীরে ভোরের রক্তিম
আলো ফোটে, তখন কুয়াশাচ্ছন্ন উপত্যকার কোলে জেগে ওঠে 'শক্ত সবুজ গাঁ'। শক্ত পাথুরে মাটির
বুকে সবুজের এই প্রকাশ এক অপূর্ব দৃশ্য।
উপসংহার: কবি কোনো কাল্পনিক স্বর্গের কথা বলেননি; তিনি চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি
করে মাটির কাছাকাছি থাকা পাহাড়ি প্রকৃতির এক জীবন্ত কোলাজ নির্মাণ করেছেন।
৫. কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত জীবন
ও সাহিত্যকীর্তির পরিচয় দাও।
উত্তর:
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন:
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় ১৯৩৩ সালের ২৫শে নভেম্বর
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বহড়ু গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং
পরবর্তীতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে পড়াশোনা করেন।
সাহিত্যজগতে আত্মপ্রকাশ ও কৃত্তিবাস যুগ:
বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত বিখ্যাত 'কবিতা' পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা 'যম' প্রকাশিত হয়।
১৯৬০-এর দশকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে 'কৃত্তিবাস' পত্রিকার মাধ্যমে তিনি বাংলা আধুনিক
কবিতার ধারাকে চিরতরে বদলে দেন। এছাড়া তিনি 'কবিতা সাপ্তাহিকী' প্রকাশ করে ادبی আলোড়ন
তোলেন।
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ:
• কাব্যগ্রন্থ: তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'হে প্রেম, হে নৈঃশব্দ্য' (১৯৬১)। মোট ৫১টি
কাব্যগ্রন্থের মধ্যে প্রধান হলো—'ধর্মে আছি জিরাফেও আছি', 'হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান',
'সোনার মাছি খুন করেছি', 'যেতে পারি কিন্তু কেন যাব' ইত্যাদি। তাঁর মোট গ্রন্থের সংখ্যা
১১১টি।
• উপন্যাস: তাঁর উল্লেখযোগ্য দুটি বিখ্যাত উপন্যাস হলো 'কুয়োতলা' ও 'অবনী বাড়ি আছো?'।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি:
তিনি 'আনন্দ পুরস্কার', 'রবীন্দ্র পুরস্কার' এবং ১৯৮৩ সালে 'যেতে পারি কিন্তু কেন যাব'
কাব্যগ্রন্থের জন্য ভারতের সর্বোচ্চ 'সাহিত্য অকাদেমি' পুরস্কার লাভ করেন।
জীবনাবসান:
শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে 'অতিথি অধ্যাপক' হিসেবে কর্মরত অবস্থায় ১৯৯৫
সালের ২৩শে মার্চ আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এই মহান স্রষ্টা প্রয়াত হন।
৬. 'পথ হারিয়ে যায় যেদিকে, সেদিকে পথ আছেই'—
উক্তিটির দার্শনিক তাৎপর্য ও জীবনের যোগসূত্র ব্যাখ্যা করো।
উত্তর:
উৎস ও প্রাসঙ্গিকতা: কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতায় প্রকৃতির উন্মুক্ত
রূপ বোঝাতে গিয়ে এই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্যটি করা হয়েছে।
দার্শনিক তাৎপর্য:
১. প্রচলিত নিয়মের অবসান: নাগরিক সমাজে প্রতিটি মানুষের পথ পূর্বনির্ধারিত—স্কুল, চাকরি,
সামাজিক প্রতিষ্ঠা ও কৃত্রিম প্রতিযোগিতা। সেখানে নির্দিষ্ট পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া মানেই
ব্যর্থতা বা বিপথগামিতা।
২. প্রকৃতির অসীম দিগন্ত: কিন্তু অরণ্য-প্রকৃতির বুকে কোনো পিচঢালা নির্দিষ্ট পথ থাকে
না। সেখানে মানুষ যেদিকেই পা বাড়ায়, সেদিকেই ঝরনা, পাথর ও বনভূমির সান্নিধ্যে এক নতুন
পথের জন্ম হয়। এখানে পথ হারানো মানে বিভ্রান্ত হওয়া নয়, বরং নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার
করা।
৩. জীবনের সাথে যোগসূত্র:
আমাদের জীবনেও যখন বাঁধাধরা নিয়মের গণ্ডি ভেঙে যায়, তখন সাময়িকভাবে মনে হতে পারে সব
শেষ হয়ে গেল। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, জীবন কোনো একমাত্রিক খাঁচা নয়। মুক্ত মন নিয়ে
এগিয়ে চললে যেকোনো অনিশ্চয়তাই এক একটি নতুন দিগন্ত ও সম্ভাবনার পথ খুলে দেয়। কবির এই
পঙক্তিটি তাই হতাশা দূর করে মুক্তভাবে বাঁচার এক সুগভীর জীবনদর্শনের প্রতীক।
৭. 'বনভূমির ওপারে কোন মনোভূমির দ'য়, / ফুসুর
ফাসুর ঘুসুর ঘাসুর স্বপ্নে কথা হয়!'— ভাবার্থ বিশ্লেষণ করো।
উত্তর:
উৎস: আলোচ্য অংশটি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতা থেকে চয়ন করা হয়েছে।
ভাবার্থ বিশ্লেষণ:
১. বহির্বিশ্ব থেকে অন্তর্জগতে উত্তরণ: কবি যখন পাহাড়ি অরণ্যের মাঝে এসে দাঁড়ান, তখন
তাঁর দৃষ্টি কেবল বাইরের গাছপালা বা পাথরে আটকে থাকে না। বাইরের 'বনভূমি'র সীমানা পেরিয়ে
তাঁর মন প্রবেশ করে মানুষের অবচেতন মনের গভীরতম প্রদেশে, যাকে কবি বলেছেন 'মনোভূমি'।
২. 'দহ' শব্দের ব্যঞ্জনা: নদীর গভীরে যেমন ঘূর্ণিজলের অতল দহ থাকে, তেমনই মানুষের মনের
ভেতরেও রয়েছে বহু না-বলা কথা, অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা ও অনুভূতির অতল গহ্বর। প্রকৃতির নির্জনতায়
সেই গোপন দহ যেন আলোড়িত হয়ে ওঠে।
৩. স্বপ্নের নিবিড় সংলাপ: 'ফুসুর ফাসুর ঘুসুর ঘাসুর'—এই ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্ত শব্দগুলির
মাধ্যমে কবি অবচেতন মনের মৃদু ফিসফিসানিকে মূর্ত করেছেন। মানুষ যখন চারপাশের কোলাহল
থেকে মুক্ত হয়ে প্রকৃতির শান্ত আশ্রয়ে ঘুমিয়ে পড়ে, তখন তার অবচেতন সত্তা প্রকৃতির চিরন্তন
প্রাণের সাথে স্বপ্নে নিবিড় সংলাপে লিপ্ত হয়।
উপসংহার: চরণ দুটিতে কবির অসাধারণ রোমান্টিক সংবেদনশীলতা এবং মানুষের অন্তর্লোকের সাথে
নৈসর্গিক নিস্তব্ধতার মিলনকে অত্যন্ত নিপুণভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।
৮. 'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতায় প্রকৃতির সাথে
নাগরিক সভ্যতার যে দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে তা আলোচনা করো।
উত্তর:
ভূমিকা: আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান সুর হলো নগরজীবনের ক্লান্তি এবং প্রকৃতির
কাছে ফিরে যাওয়ার আকুলতা। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতায় এই চিরন্তন
দ্বন্দ্বটি অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে রূপায়িত হয়েছে।
নাগরিক সভ্যতার রূপ:
কবিতায় সরাসরি নগরের বিশদ বর্ণনা না থাকলেও 'খাঁচা' শব্দের মাধ্যমে তার সারবত্তা তুলে
ধরা হয়েছে। শহরের জীবন কৃত্রিম, সংকীর্ণ এবং সেখানে মানুষ নিয়মের বেড়াজালে বন্দি। ধোঁয়াশা,
কোলাহল আর স্বার্থপরতার খাঁচায় মানুষের মুক্ত আনন্দ বা 'সহজ করে বাঁচা' সম্পূর্ণ অসম্ভব।
প্রকৃতির রূপ:
অপরদিকে তিনপাহাড়ের প্রকৃতি সম্পূর্ণ মুক্ত, উদার ও প্রাণময়। সেখানে রয়েছে নির্জন স্টেশন,
আকাশভরা তারা, ঝরনা, কাঁদড়, বনভূমি এবং দিগন্তজোড়া সবুজ। এখানে মানুষ কোনো নিয়মের শৃঙ্খলে
বন্দি নয়; এখানে পথ হারিয়ে যাওয়ার মধ্যেই রয়েছে পরম স্বাধীনতা।
দ্বন্দ্বের সমাধান:
কবি এই দুই বিপরীত মেরুর মধ্যে প্রকৃতিকেই মানুষের আদি ও আসল আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
শহরের খাঁচায় যে মানুষ ক্লান্ত, তিনপাহাড়ের কোলে শিশুর নিষ্পাপ কলরব ও মুক্ত প্রকৃতির
স্পর্শে সে পুনরায় জীবনের প্রকৃত সহজ আনন্দের সন্ধান পায়।
৯. 'পুব আকাশে আস্তে-ধীরে আলোর ঘোমটা খোলে,
/ শক্ত সবুজ গাঁ ভেসেছে তিনপাহাড়ের কোলে।'— ভোর ও সকালের দৃশ্যটি নিজের ভাষায় লেখো।
উত্তর:
পটভূমি: রাতের অন্ধকারে তারায় ভরা আকাশের নিচে তিনপাহাড়ের অরণ্যে যে রোমাঞ্চকর পরিবেশ
তৈরি হয়েছিল, ভোরের আগমনে তা এক শান্ত ও প্রশান্ত রূপ ধারণ করে।
ভোরের দৃশ্যপট:
১. আলোর উন্মোচন: পাহাড়ি আকাশে সকালের আলো আকস্মিকভাবে তীব্র হয়ে দেখা দেয় না। পুব
আকাশে রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ে ধীরে ধীরে। কবি এই প্রক্রিয়াটিকে এক লাজুক নববধূর আলতো
করে ঘোমটা খোলার সাথে তুলনা করেছেন। কুয়াশার সূক্ষ্ম আবরণ সরিয়ে আলো যেন ধীরে ধীরে
পৃথিবীর রূপ প্রকাশ করে।
২. শক্ত সবুজ গ্রামের রূপ: আলো ফোটার সাথে সাথেই তিনপাহাড়ের উপত্যকার কোলে দৃশ্যমান
হয়ে ওঠে এক অপরূপ গ্রামীণ জনপদ। পাহাড়ি অঞ্চলের মাটি শক্ত ও পাথুরে, কিন্তু সেই রূঢ়
মাটির বুকে অরণ্য ও গাছপালার শ্যামল সজীবতা কোনো বাধা মানেনি। তাই গ্রামটি একই সাথে
'শক্ত' এবং 'সবুজ'।
৩. ভাসমান গ্রামের মায়াবী রূপ: সকালের কুয়াশা ও ভোরের আলো-আঁধারির খেলায় গ্রামটিকে
দেখে মনে হয় যেন তা পাহাড়ের কোলে পরম নিশ্চিন্তে ভেসে রয়েছে কোনো স্বপ্নলোকের মতো।
উপসংহার: এই দৃশ্যটি রাতের রহস্যময়তাকে মুছে দিয়ে এক পরম আশ্বস্ত ও নির্মল শান্তিময়
পৃথিবীর বার্তা বহন করে আনে।
১০. 'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতার কাব্যভাষা,
ছন্দ ও অলঙ্কারগত বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করো।
উত্তর:
ভূমিকা: শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখনী শৈলী যেমন সাবলীল, তেমনই গভীর ব্যঞ্জনাপূর্ণ। আলোচ্য
কবিতায় তাঁর ভাষা ও আঙ্গিকের এক অনন্য উৎকর্ষ পরিলক্ষিত হয়।
১. ছন্দ বৈশিষ্ট্য:
কবিতাটি মূলত মাত্রাবৃত্ত ছন্দের এক মিষ্টি চাল ও সুরময় বিন্যাসে রচিত। প্রতিটি পঙক্তির
শেষে চমৎকার দ্বিপদী বা যুগলবন্দি (Couplet) অন্ত্যমিল রয়েছে (যেমন—নেমে/ফ্রেমে, তারায়/হারায়,
আছেই/কাছেই, দ'য়/হয় ইত্যাদি), যা আবৃত্তিকে অত্যন্ত শ্রুতিমধুর করে তোলে।
২. শব্দচয়ন ও দেশজ শব্দের প্রয়োগ:
কবি তৎসম ও তদ্ভব শব্দের সাথে প্রচুর আঞ্চলিক ও লোকায়ত শব্দের মিশেল ঘটিয়েছেন। 'কাঁদড়',
'সক্কলে', 'দ'য়', 'গাঁ' এবং ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্ত শব্দ 'ফুসুর ফাসুর ঘুসুর ঘাসুর'
কবিতার পরিবেশকে মাটির কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।
৩. চিত্রকল্প ও রূপক অলঙ্কার:
• রূপক (Metaphor): 'খাঁচা' নাগরিক জীবনের রূপক, আর 'নকশিকাঁথা' গ্রামীণ প্রকৃতির রূপক।
• মানবত্বারোপ (Personification): 'আলোর ঘোমটা খোলে'—প্রকৃতিকে মানবিক লাবণ্যে অভিষিক্ত
করা হয়েছে।
• দৃশ্য চিত্রকল্প: তারাময় রাতের আকাশ এবং ভোরের কুয়াশায় ভাসমান শক্ত সবুজ গ্রাম এক
একটি জীবন্ত ক্যানভাস তৈরি করে।
উপসংহার: সহজ ভাষা ও গভীর দার্শনিক অনুভূতির সার্থক মেলবন্ধনে কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের
এক অনন্য সম্পদ হয়ে উঠেছে।
১১. তিনপাহাড়ের কোলে শিশুদের ভূমিকা ও উপস্থিতির
প্রাসঙ্গিকতা কবিতার আলোকে বিচার করো।
উত্তর:
ভূমিকা: একটি কবিতার চূড়ান্ত পরিণতির ওপর নির্ভর করে তার চিরন্তন সার্থকতা। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের
'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতার অন্তিম চরণে শিশুদের আগমন কবিতাটিকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে
দিয়েছে।
শিশুদের উপস্থিতির গুরুত্ব:
১. নিষ্পাপ সারল্যের প্রতীক: শিশুরা প্রকৃতির মতোই সহজ, অকপট ও কৃত্রিমতামুক্ত। তারা
কোনো জটিল হিসাব-নিকাশ বা নাগরিক অহংকার নিয়ে বাঁচে না।
২. খাঁচামুক্ত জীবনের প্রতিচ্ছবি: কবি যখন প্রশ্ন করেন—'সহজ করে বাঁচা কি আর খাঁচাতে
সম্ভব?'—তার অব্যবহিত পরেই তিনি উত্তর দেন শিশুর কলরবের মাধ্যমে। খাঁচার বাইরেই শিশুদের
স্বাধীন আনন্দ ও খেলাধুলা সম্ভব।
৩. ভবিষ্যৎ ও জীবনের আশাবাদ: রাতের অন্ধকার ও নির্জনতার পর ভোর হওয়া এবং সেই ভোরে শিশুর
কলকাকলি মুখরিত হওয়া স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে জীবন থেমে থাকে না। শিশুরাই ভবিষ্যৎ পৃথিবীর
ধারক।
উপসংহার: তিনপাহাড়ের নকশিকাঁথার মতো সুন্দর শান্ত নিসর্গে শিশুদের উচ্ছ্বল উপস্থিতি
এক নতুন প্রাণের জোয়ার আনে এবং মানবসভ্যতাকে পুনরায় প্রকৃতির সহজ সারল্যে ফেরার দিকনির্দেশ
দেয়।
১২. কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রকৃতিভাবনার
সাথে জীবনানন্দের প্রকৃতিভাবনার একটি তুলনামূলক আলোচনা করো।
উত্তর:
ভূমিকা: বাংলা আধুনিক কবিতায় জীবনানন্দ দাশ এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায় উভয়ই ছিলেন অরণ্য
ও প্রকৃতির অতলান্তিক রূপকার, তবে তাঁদের প্রকাশভঙ্গিতে ছিল স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।
জীবনানন্দ দাশের প্রকৃতি:
জীবনানন্দের প্রকৃতি মূলত ধূসর, বিষণ্ণ, ইতিহাসসচেতন এবং স্মৃতিকাতর। হিজল, জাম, ধানসিঁড়ি
আর রূপসী বাংলার নিবিড় নির্জনতায় তিনি খুঁজেছেন এক নিঃসঙ্গ আশ্রয় ও বিপন্ন মানবতার
সান্ত্বনা।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রকৃতি:
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রকৃতি অনেক বেশি বোহেমিয়ান, সতেজ, রহস্যময় এবং রোমাঞ্চকর।
'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতায় তাঁর প্রকৃতি খাঁচাভাঙা মুক্তির ডাক দেয়। এখানে অন্ধকার,
তারাময় আকাশ, রুক্ষ পাহাড় এবং সবুজ বনের মাঝে কবি খুঁজে পান অফুরন্ত জীবনীশক্তি ও বাঁচার
আনন্দ।
সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য:
উভয় কবিই নাগরিক যান্ত্রিকতা ও কৃত্রিমতা থেকে মুক্তি পেতে প্রকৃতির নিবিড় আশ্রয়ে ছুটে
গেছেন। তবে জীবনানন্দের সুর যেখানে শান্ত ও বিষাদময়, শক্তির সুর সেখানে তীব্র, স্বতঃস্ফূর্ত
ও প্রাণের কলরবে মুখরিত।
১৩. 'তিনপাহাড়ের নকশিকাঁথায় শিশুর কলবর'—
কেন গ্রামটিকে 'নকশিকাঁথা' বলা হয়েছে এবং শিশুর কলরবের তাৎপর্য কী?
উত্তর:
নকশিকাঁথা বলার কারণ:
বাংলার লোকসংস্কৃতিতে নকশিকাঁথা হলো মমতা, নান্দনিকতা ও বহু রঙের সুতোর নিখুঁত বুনন।
তিনপাহাড়ের প্রাকৃতিক উপত্যকাটিকে উপর থেকে দেখলে মনে হয় যেন এক সুবিশাল জীবন্ত নকশিকাঁথা।
এখানে রয়েছে লালচে মাটির পথ, রুক্ষ ধূসর পাথর, নীল জলধারা বা ঝরনা, সবুজ বনানী এবং
ছোট ছোট পাহাড়ি টিলা। প্রকৃতির এই বৈচিত্র্যময় রঙের বুনন মাটির তৈরি এক নিখুঁত শিল্পের
মতো ফুটে উঠেছে বলেই একে 'নকশিকাঁথা' বলা হয়েছে।
শিশুর কলরবের তাৎপর্য:
নকশিকাঁথা যেমন প্রাণহীন কোনো যান্ত্রিক বস্তু নয়, তার সাথে জড়িয়ে থাকে নারীর মমতা;
তেমনই তিনপাহাড়ের নিসর্গ কোনো জনশূন্য মরুভূমি নয়। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই সেখানে
শুরু হয় গ্রামীণ শিশুদের আনন্দময় কোলাহল ও কলরব।
এই কলবর নাগরিক জটিলতাহীন এক সহজ-সরল জীবনের প্রতীক। শিশুর কলরবের মধ্য দিয়েই প্রমাণিত
হয় যে খাঁচাবন্দি শহরের চেয়ে মাটির কোলে গড়ে ওঠা এই মুক্ত গ্রামেই জীবন অনেক বেশি সজীব,
সত্য ও সুন্দর।
১৪. 'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতাটির নামকরণের
সার্থকতা সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিচার করো।
উত্তর:
ভূমিকা: সাহিত্যের যেকোনো সৃষ্টির ক্ষেত্রে নামকরণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তা রচনার
মূল ভাব ও বিষয়ের দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
নামকরণের তাৎপর্য বিচার:
১. ভৌগোলিক অবস্থান: কবিতাটির শুরুতেই তিন বন্ধু ট্রেনের থেকে নামেন 'তিনপাহাড়' নামক
একটি স্টেশনে। স্থানটি ঝাড়খণ্ড অঞ্চলের পাহাড়ি জনপদ। সমগ্র দৃশ্যপট, রাতের নির্জনতা,
বুনো প্রকৃতি এবং সকালের রূপ এই অঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
২. ভাবানুষঙ্গিক তাৎপর্য: 'কোলে' শব্দটি মাতৃত্ব, পরম আশ্রয় ও সুরক্ষার ইঙ্গিতবাহী।
তিনটি পাহাড় যেন এক দুর্গের মতো স্নেহভরে আগলে রেখেছে শান্ত গ্রামটিকে, অরণ্যকে এবং
সেখানকার মুক্ত জীবনকে। শহরের কোলাহল ও হিংস্রতা থেকে দূরে এই উপত্যকা মানুষকে এক অপার্থিব
আশ্রয়ের স্বাদ দেয়।
৩. প্রাকৃতিক রূপক: তিনপাহাড়ের প্রাকৃতিক কোলে এসে মানুষ নিজের কৃত্রিম খাঁচা ভুলে
প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয় এবং শিশুর সারল্য নিয়ে পুনর্জন্ম লাভ করে।
উপসংহার: বিষয়বস্তু, স্থানমাহাত্ম্য এবং অন্তর্নিহিত ভাব—সবদিক বিচার করে কবি শক্তি
চট্টোপাধ্যায়ের দেওয়া 'তিনপাহাড়ের কোলে' নামকরণটি অত্যন্ত সংগত, ব্যঞ্জনাধর্মী ও সার্থক
হয়েছে।
১৫. কবিতায় ব্যবহৃত প্রতীক ও রূপকগুলির বিশদ
বিশ্লেষণ করো (খাঁচা, নকশিকাঁথা, ফ্রেম, আলোর ঘোমটা)।
উত্তর:
ভূমিকা: কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় 'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতায় বেশ কিছু শক্তিশালী প্রতীক
ও রূপক ব্যবহারের মাধ্যমে কবিতার ভাবগাম্ভীর্য বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছেন।
প্রধান প্রতীক ও রূপকসমূহ:
১. 'ফ্রেম': সাধারণ অর্থে ফ্রেম হলো ছবির বাঁধাই করা কাঠামো। কবিতায় এটি প্রকৃতির নিখুঁত
সৌন্দর্যের প্রতীক। পর্যটকদের চোখ যখন সেই অপার্থিব সৌন্দর্যে নিস্পন্দ হয়ে যায়, তখন
মনে হয় যেন তারা এক জীবন্ত ছবির ফ্রেমে বাঁধা পড়েছে।
২. 'খাঁচা': খাঁচা হলো আধুনিক যান্ত্রিক নগরজীবন, কৃত্রিম সামাজিক শৃঙ্খল ও স্বার্থপর
প্রতিযোগিতার সর্বজনীন প্রতীক। খাঁচায় পাখি যেমন তার ডানা মেলার স্বাধীনতা হারায়, মানুষও
তেমনই শহরে সহজভাবে বাঁচার আনন্দ হারায়।
৩. 'নকশিকাঁথা': এটি চিরায়ত গ্রামীণ লোকশিল্প ও ভালোবাসার বুনন। বিচিত্র রঙের পাহাড়,
অরণ্য, ঝরনা ও লাল মাটির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা গ্রামটিকে কবি এক পরম মমতাময় নকশিকাঁথা হিসেবে
রূপায়িত করেছেন।
৪. 'আলোর ঘোমটা': এটি মানবত্বারোপিত রূপক। ভোরের সূর্যোদয়কে লাজুক নববধূর মুখ উন্মোচনের
সাথে তুলনা করে কবি প্রকৃতির স্নিগ্ধতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
১৬. মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের জন্য 'তিনপাহাড়ের
কোলে' কবিতা থেকে কী কী শিক্ষণীয় মূল্যবোধ পাওয়া যায়?
উত্তর:
ভূমিকা: সাহিত্য কেবল আনন্দের খোরাক নয়, তা মানুষের মনে উচ্চতর মূল্যবোধ গড়ে তোলে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতা থেকে শিক্ষার্থীরা বহু ইতিবাচক শিক্ষা
অর্জন করতে পারে।
শিক্ষণীয় দিকসমূহ:
১. প্রকৃতির প্রতি অনুরাগ: ইট-কাঠ ও মোবাইল-কম্পিউটারের কৃত্রিম দুনিয়ায় বন্দি বর্তমান
প্রজন্মকে এই কবিতা প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে যাওয়ার ও পরিবেশকে ভালোবাসার প্রেরণা
দেয়।
২. বাঁধাধরা গণ্ডি থেকে মুক্তি: জীবনে কেবল তথাকথিত বাঁধাধরা ছকে সফল হওয়াই শেষ কথা
নয়; অজানাকে জানার কৌতূহল এবং নতুন পথ আবিষ্কারের সাহস থাকা প্রয়োজন।
৩. সারল্যের সাধনা: অহংকার, জটিলতা ও যান্ত্রিকতা মানুষের আত্মাকে নিঃস্ব করে দেয়।
গ্রামীণ শিশু ও প্রান্তিক মানুষের সহজ-সরল জীবনধারাই প্রকৃত সুখের মূল চাবিকাঠি।
৪. সৌন্দর্যবোধের উন্মেষ: তারাময় আকাশ, নির্জন পাহাড় আর ভোরের আলোর মতো সাধারণ প্রাকৃতিক
দৃশ্যের মধ্যেও যে অসীম আনন্দ লুকিয়ে থাকে, তা উপলব্ধি করার নান্দনিক দৃষ্টি তৈরি হয়।
১৭. 'ফুসুর ফাসুর ঘুসুর ঘাসুর স্বপ্নে কথা
হয়!'— কবিতার এই অদ্ভুত ধ্বন্যাত্মক পঙক্তিটির শিল্পমূল্য বিচার করো।
উত্তর:
ভূমিকা: আধুনিক বাংলা কবিতার বিশিষ্ট কারিগর শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাঁর লেখনীতে অভিনব
শব্দপ্রয়োগের জন্য সুবিখ্যাত ছিলেন। 'ফুসুর ফাসুর ঘুসুর ঘাসুর' পঙক্তিটি তাঁর সেই অনন্য
নিরীক্ষার এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
শিল্পমূল্য বিচার:
১. ধ্বনিমাধুর্য ও আবহ সৃষ্টি: শব্দগুলি অনুকরণাত্মক এবং এদের উচ্চারণের মাধ্যমেই এক
মৃদু, রহস্যময় ও নিভৃত ফিসফিসানির আবহ রচিত হয়। গভীর রাতে পাহাড়ি অরণ্যে বাতাসের মর্মরধ্বনি
কিংবা মনের অবচেতন গুঞ্জনকে বোঝাতে এই দ্বিরুক্ত শব্দগুলি অতুলনীয়।
২. অবচেতন মনের ভাষা: মানুষ যখন জাগ্রত থাকে তখন সে ব্যাকরণসিদ্ধ যুক্তির ভাষায় কথা
বলে। কিন্তু ঘুমের মধ্যে স্বপ্নের জগতে মনের ভাব কোনো বাঁধাধরা নিয়ম মানে না। অবচেতন
মনের সেই রহস্যময় অস্পষ্ট অনুভূতিকে কবি এই শব্দের বুননে জীবন্ত করেছেন।
৩. কবিতায় আধুনিকতার ছোঁয়া: লোকায়ত জীবনের আঞ্চলিক বা মৌখিক ধ্বনিকে উচ্চাঙ্গের কবিতায়
সংস্থাপন করে কবি আধুনিক কবিতার সীমানাকে আরও প্রসারিত করেছেন।
উপসংহার: এটি কেবল কোনো নিরর্থক শব্দের খেলা নয়, বরং প্রকৃতির রহস্যময়তার সাথে মানুষের
মনের অতল সংযোগ ঘটানোর এক নিখুঁত শৈল্পিক কৌশল।
১৮. 'এমন একটি দেশে আসলে সক্কলে পথ হারায়।'—
'দেশ' বলতে এখানে কী বোঝানো হয়েছে এবং পথ হারানোর স্বরূপ আলোচনা করো।
উত্তর:
উৎস: আলোচ্য বাক্যটি কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতা থেকে চয়ন করা
হয়েছে।
'দেশ' শব্দের অর্থ:
এখানে 'দেশ' বলতে কোনো রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক রাষ্ট্রকে বোঝানো হয়নি। কবি 'দেশ' বলতে
তিনপাহাড়ের অরণ্যবেষ্টিত, কোলাহলমুক্ত, আদিম ও স্বর্গীয় প্রাকৃতিক নিসর্গখণ্ডকে বুঝিয়েছেন—যা
নাগরিক কৃত্রিমতার সম্পূর্ণ বিপরীত এক স্বপ্নলোক।
পথ হারানোর স্বরূপ:
১. আত্মবিস্মৃতির আনন্দ: সাধারণ জগতে পথ হারানো মানে বিপদ, আতঙ্ক বা দিশাহীনতা। কিন্তু
তিনপাহাড়ের দেশে এসে পথ হারানো এক গভীর মুক্তির অনুভূতি। শহরের মানুষ যখন এখানে আসে,
তখন সে তার চেনা হিসাব, অহমিকা, কর্মব্যস্ততা ও সামাজিক অবস্থান ভুলে যায়।
২. নতুন সৃষ্টির সূচনা: প্রকৃতির বুকে পথ হারানোর অর্থ হলো কোনো পূর্বনির্ধারিত পথে
সীমাবদ্ধ না থেকে অবাধ স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া। যেদিকেই তাকানো যায়—ঝরনা, কাঁদড়, পাথর
আর বনের মাঝে সর্বত্রই নতুন আনন্দের পথ উন্মোচিত হয়।
উপসংহার: এই পথ হারানো আসলে নিজেকে প্রকৃতির মাঝে সমর্পণ করে এক বৃহত্তর সত্য ও আধ্যাত্মিক
মুক্তির সন্ধান পাওয়া।
১৯. তিনপাহাড়ের নৈসর্গিক রূপের প্রেক্ষাপটে
'মনোভূমির দহ' কীভাবে আলোড়িত হয় তা আলোচনা করো।
উত্তর:
ভূমিকা: শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কাব্যের অন্যতম শক্তি হলো বাহ্যিক প্রকৃতির সাথে মানুষের
অন্তর্লোকের নিবিড় সেতুবন্ধন রচনা করা। 'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতায় এই সংযোগটি চমৎকারভাবে
ব্যক্ত হয়েছে।
'মনোভূমির দহ' ও তার আলোড়ন:
১. নিস্তব্ধতার প্রভাব: দিনের ব্যস্ততায় মানুষের মন বহির্মুখী থাকে। কিন্তু তিনপাহাড়ের
জনহীন স্টেশন ও তারায় ভরা রাতের আকাশ মানুষের মনকে অন্তর্মুখী করে তোলে।
২. অবচেতনের জাগরণ: বহির্বিশ্বের গভীর অরণ্য মানুষের মনের ভেতরে সুপ্ত থাকা আদিম আকাঙ্ক্ষা
ও আবেগের 'দহ' বা অতল গহ্বরকে স্পর্শ করে। তখন মনের গভীর তলদেশ থেকে নানা না-বলা স্বপ্ন
ও অনুভূতি জেগে ওঠে।
৩. একাত্মতা: মানুষ বুঝতে পারে যে সে প্রকৃতি থেকে আলাদা কিছু নয়; তার মনের গভীর ভাবনার
সাথে ঝরনা, টিলা ও পাথরের চিরন্তন প্রবাহের কোনো প্রভেদ নেই। এই উপলব্ধিতেই মানুষের
মনোভূমির অতল দহ এক পরম শান্তিতে আলোড়িত হয়ে ওঠে।
২০. 'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতাটি আধুনিক জীবনের
কোলাহলে কীভাবে মানসিক প্রশান্তির দিশারি হতে পারে? বিস্তারিত আলোচনা করো।
উত্তর:
ভূমিকা: একুশ শতকের দ্রুতগামী, মানসিক চাপযুক্ত ও যান্ত্রিক জীবনে মানুষ যখন প্রতিনিয়ত
উদ্বেগ ও ক্লান্তিতে জর্জরিত, তখন শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'তিনপাহাড়ের কোলে' কবিতাটি
এক পশলা ঠাণ্ডা বাতাসের মতো মানসিক প্রশান্তির বার্তা দেয়।
প্রশান্তির উপাদানসমূহ:
১. নিস্তব্ধতার মহিমা: কবিতাটি আমাদের শেখায় যে জীবনের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর কোলাহলের
মাঝে পাওয়া যায় না। নির্জন প্রকৃতির কাছে গিয়ে মৌন থাকলেই হৃদয়ের ক্ষত উপশম হয়।
২. বন্ধনমুক্তির প্রেরণা: নাগরিক খাঁচার কৃত্রিম চাহিদা ও প্রতিযোগিতার বাইরে যে এক
বিশাল উন্মুক্ত জগৎ রয়েছে, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট পথের দাবি নেই—কবিতাটি পাঠককে সেই
মুক্তির আস্বাদ এনে দেয়।
৩. প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের থেরাপি: তারাময় আকাশ, ভোরের স্নিগ্ধ আলো, কুয়াশায় ঢাকা সবুজ
গ্রাম এবং শিশুদের কলরব মানুষের মনে জমে থাকা সমস্ত বিষাদ ধুয়ে-মুছে দেয়।
উপসংহার: এই কবিতাটি পড়ার মাধ্যমে পাঠক মানসিকভাবে এক কল্পভ্রমণে চলে যায় তিনপাহাড়ের
পাহাড়ি উপত্যকায়, যা তার ক্লান্ত মনকে নতুন উদ্যম, সজীবতা ও সহজভাবে বাঁচার গভীর আত্মবিশ্বাস
জোগায়।