শাবলতলার
মাঠ — বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
মাধ্যমিক পরীক্ষার স্পেশাল পূর্ণাঙ্গ সাজেশন
ও প্রশ্নোত্তর সম্ভার
(মান ১: ১০০টি | মান ৩: ৫০টি | মান ৫: ২০টি — সর্বমোট ১৭০টি প্রশ্নোত্তর)
বিভাগ ক: অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী
প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১) — [১০০টি]
১. 'শাবলতলার মাঠ' পাঠ্যাংশটির রচয়িতা
কে?
উত্তর: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
২. লেখক শৈশবে কার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা
করতেন?
উত্তর: পিসিমার বাড়িতে।
৩. ছেলেবেলায় লেখক কোন্ পাঠশালায় পড়াশোনা
করতেন?
উত্তর: দুর্গাপুর উচ্চ প্রাইমারি
পাঠশালায়।
৪. লেখক কত বছর পর আবার শাবলতলার মাঠ
দেখতে পান?
উত্তর: প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ
বছর পর।
৫. পিসিমা মারা যাওয়ার পর লেখক সে
গ্রামে যাননি কেন?
উত্তর: কারণ সে গ্রামে লেখকের
আর কোনো কাজ বা যাওয়া-আসার উপলক্ষ ছিল না।
৬. সেদিন লেখক কী যানে চড়ে যাচ্ছিলেন?
উত্তর: গোরুর গাড়িতে চড়ে।
৭. লেখক সেদিন কোন্ উদ্দেশ্যে সে অঞ্চলে
যাচ্ছিলেন?
উত্তর: মেয়ের বিয়ের পাত্র
খুঁজতে।
৮. লেখক কোন্ স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমেছিলেন?
উত্তর: মার্টিন লাইনের ছোটো
স্টেশনে।
৯. শাবলতলার মাঠ দেখে লেখকের প্রথম
কী মনে হয়েছিল?
উত্তর: মস্ত বড়ো কী এক কারখানা
তৈরি হচ্ছে সেখানে।
১০. মাঠের ওপর দিয়ে কিসের লাইন পাতা
হয়েছিল?
উত্তর: বড়ো রেল লাইন।
১১. মাঠের চারপাশে কাদের চালাঘর ও
তাঁবু পাতা ছিল?
উত্তর: কুলিমজুর, এঞ্জিনিয়ার
ও ওভারসিয়ারদের।
১২. মাঠের নতুন তৈরি রাস্তায় কার মোটর
গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল?
উত্তর: পাঞ্জাবি কন্ট্রাকটরের
মোটর গাড়ি।
১৩. মাঠের বাতাসে কিসের ধুলো উড়ছিল?
উত্তর: চুনের ধুলো ও সিমেন্টের
ধুলো।
১৪. শাবলতলার মাঠে কারখানা তৈরির কারণে
কোন্ কোন্ গ্রাম উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে?
উত্তর: বাজিতপুর, মনসাতলা,
ছাওয়াল-মারি, বেদে-পোতা এবং হাঁসখালির চড়া পর্যন্ত গ্রামগুলো।
১৫. গোরুর গাড়ির গাড়োয়ানকে লেখক কী
জিজ্ঞাসা করেছিলেন?
উত্তর: “হ্যাঁরে, এটা শাবলতলার
মাঠ, না?”
১৬. গাড়োয়ান মাঠের পরিবর্তনের কারণ
হিসেবে কী বলেছিল?
উত্তর: কলকারখানা বসছে বলে
জানিয়েছিল।
১৭. শাবলতলার মাঠ দেখে লেখকের কত বছর
বয়সের একটি দিনের কথা মনে পড়েছিল?
উত্তর: এগারো বছর বয়সের
একটি মধ্যাহ্নদিনের কথা।
১৮. দুর্গাপুর ইউ পি পাঠশালার হেডমাস্টার
কে ছিলেন?
উত্তর: উমাচরণ মাস্টার।
১৯. উমাচরণ মাস্টারের বাসা কোথায় ছিল?
উত্তর: গ্রামের রায় জমিদারদের
ভাঙা কার্নিসে পায়রার বাসাওলা বৈঠকখানার একপাশে সেকেলে তক্তপোশে।
২০. উমাচরণ মাস্টারের দেয়ালে পেরেকের
গায়ে কী ঝুলত?
উত্তর: তাঁর হুঁকো ঝুলত।
২১. উমাচরণ মাস্টারের বাঁশের আলনায়
কী কী ঝোলানো থাকত?
উত্তর: দুখানা আধময়লা ধুতি
ও এক এবং অদ্বিতীয় পিরানটি।
২২. মাস্টারমশায়ের তক্তপোশের নীচে
কী কী জিনিস থাকত?
উত্তর: একজোড়া কাঠের খড়ম,
একটি টিনের বিবর্ণ তোরঙ্গ, চটের-থলে-ভর্তি টুকিটাকি জিনিস, পাকা বাঁশের লাঠি এবং তেলে-জলে
পাকানো বেত।
২৩. উমাচরণ মাস্টারের তক্তপোশের নীচের
কোন্ জিনিসটি লেখকের সবচেয়ে বেশি মনে ছিল?
উত্তর: একগাছা তেলে-জলে
পাকানো বেত।
২৪. উমাচরণ মাস্টারের মুখমণ্ডলের গড়ন
কেমন ছিল?
উত্তর: দীর্ঘগুম্ফযুক্ত
এবং বসন্তের দাগ-আঁকা প্রৌঢ় মুখমণ্ডল।
২৫. উমাচরণ মাস্টার ক্লাসে কীভাবে
বসে বই পড়তেন?
উত্তর: টেবিলের ওপর পা তুলে
গম্ভীরভাবে।
২৬. উমাচরণ মাস্টারের লেখা বইটির নাম
কী ছিল?
উত্তর: ‘আক্কেল গুড়ুম’।
২৭. উমাচরণ মাস্টার ‘আক্কেল গুড়ুম’
বইটিকে সাহিত্যের কোন্ শ্রেণিভুক্ত বলতেন?
উত্তর: ‘প্রহসন’।
২৮. শৈশবে লেখক কোন্ দুটি কথার অর্থ
বুঝতেন না?
উত্তর: ‘আক্কেল গুড়ুম’ ও
‘প্রহসন’।
২৯. উমাচরণ মাস্টারের ‘আক্কেল গুড়ুম’
প্রহসনে কোন্ ধরনের চরিত্রের উল্লেখ ছিল?
উত্তর: একটি ইংরেজি-পড়া
ছোকরার কথা ছিল।
৩০. গোবরডাঙার সেজোবাবুর শালা উমাচরণবাবুকে
কী বলেছিলেন?
উত্তর: “উমাচরণবাবু, আপনি
কালে গিরিশ ঘোষের সমান লেখক হবেন।”
৩১. লেখক যখন গিরিশ ঘোষের পরিচয় জানতে
চান, মাস্টারমশাই কী উত্তর দেন?
উত্তর: অনুকম্পার হাসি হেসে
লেখককে অজ্ঞ বলে বিস্ময় প্রকাশ করেন।
৩২. উমাচরণ মাস্টার ছাত্রদের কাছে
নিজের কোন্ মূল্যবান বইটি বিক্রি করতেন?
উত্তর: ‘আক্কেল গুড়ুম’।
৩৩. স্কুলের মাইনের টাকা দিলে উমাচরণ
মাস্টারের কী অদ্ভুত রীতি ছিল?
উত্তর: খুচরো পয়সা ফেরত
না দিয়ে নিজের লেখা ‘আক্কেল গুড়ুম’ বই দিয়ে দিতেন।
৩৪. পিসিমা লেখকের হাত থেকে ‘আক্কেল
গুড়ুম’ বই দেখে কী বলেছিলেন?
উত্তর: “যেমন পোড়ারমুখো
মাস্টার তেমনই পোড়ারমুখো ছেলে!”
৩৫. পিসিমা ‘আক্কেল গুড়ুম’ বই ফেরত
দিয়ে কোন্ বই আনতে বলেছিলেন?
উত্তর: ‘কেষ্টর শতনাম’।
৩৬. পিসিমা উমাচরণ মাস্টারের পাণ্ডিত্যের
বড়াই শুনে কী মন্তব্য করেছিলেন?
উত্তর: “গাল টিপলে দুধ বেরোয়
উনি জানেন- ফাজিল কোথাকার!”
৩৭. উমাচরণ মাস্টারের মতে বড়ো বড়ো
লেখকরা প্রথম জীবনে কী করতেন?
উত্তর: স্কুল-মাস্টারি করতেন।
৩৮. উমাচরণ মাস্টারকে তাঁর বয়স কত
তা কোন্ ছাত্র জিজ্ঞাসা করেছিল?
উত্তর: সারদা।
৩৯. সারদার প্রশ্নের উত্তরে মাস্টারমশাই
কী করেছিলেন?
উত্তর: ধমক দিয়ে বসিয়ে দিয়েছিলেন।
৪০. সারদার মনে মাস্টারমশাইকে নিয়ে
কী খটকা লেগেছিল?
উত্তর: এই বয়সেও যদি তিনি
স্কুলে মাস্টারি করে যান, তবে কোন্ বয়সে গিয়ে বড়ো কাজ করবেন?
৪১. কোন্ ছাত্র উমাচরণ মাস্টারকে খুব
বড়ো পণ্ডিত ও কবি বলে মনে করত?
উত্তর: সতু।
৪২. উমাচরণ মাস্টার রোজ কোথায় বসে
আপনমনে লিখতেন?
উত্তর: চালতেবাগানের প্রাচীন
আম-তেঁতুলের ছায়ায় মাঠের ধারে বসে।
৪৩. চালতেবাগানের পরিবেশ কেমন ছিল?
উত্তর: আম-তেঁতুলের ঘন ছায়ায়
দিনমানেই সন্ধ্যার মতো অন্ধকার।
৪৪. চালতেবাগানে মাস্টারমশাই কীসের
ওপর বসে লিখতেন?
উত্তর: একটি ছেঁড়া মাদুর
পেতে।
৪৫. কাগজ যাতে বাতাসে উড়ে না যায় সেজন্য
মাস্টারমশাই কী ব্যবহার করতেন?
উত্তর: মাটির ছোটো ছোটো
ঢেলা চাপা দিতেন।
৪৬. লেখকরা বা কবিরা আপনমনে হাসেন
ও বিড়বিড় করেন— এ কথা লেখককে কে বুঝিয়েছিল?
উত্তর: সতু।
৪৭. চালতেবাগানের শ্যাওড়া ঝোপের পাশে
কোন্ ফলের গাছ ছিল?
উত্তর: বড়ো একটা কতবেল গাছ
ছিল।
৪৮. কতবেল খাওয়ার লোভ লেখক কেন দমন
করেছিলেন?
উত্তর: জীবন্ত কবিকে স্বচক্ষে
দেখার আনন্দ ও বিস্ময়ে।
৪৯. লেখকের মায়ের বড়ো ভাই উমাচরণ মাস্টারকে
কী বলে ডাকতেন?
উত্তর: ‘দাদা’ বলে ডাকতেন।
৫০. লেখকের বড়ো মামার বয়স তখন কত ছিল?
উত্তর: পঁয়ত্রিশ বছর।
৫১. লেখকের অনুমানে তখন উমাচরণ মাস্টারের
বয়স কত ছিল?
উত্তর: চল্লিশের ওপর।
৫২. উচ্চ প্রাইমারি পরীক্ষা দেওয়ার
জন্য দুর্গাপুর স্কুল থেকে কটি ছেলে প্রস্তুত হয়েছিল?
উত্তর: চারটি ছেলে।
৫৩. উচ্চ প্রাইমারি পরীক্ষা দিতে যাওয়া
চারটি ছেলের নাম কী কী?
উত্তর: চক্কত্তিদের কানাই,
লেখক স্বয়ং, সতু এবং সারদা।
৫৪. পরীক্ষা দিতে তারা কার সঙ্গে কোথায়
যাচ্ছিল?
উত্তর: উমাচরণ মাস্টারের
সঙ্গে রানাঘাটে।
৫৫. দুর্গাপুর থেকে শাবলতলার মাঠের
দূরত্ব কতখানি ছিল?
উত্তর: প্রায় দু ক্রোশ থেকে
আড়াই ক্রোশ পথ।
৫৬. পরীক্ষা দিতে বের হওয়ার সময় শাবলতলার
মাঠে পৌঁছাতে বেলার অবস্থা কেমন ছিল?
উত্তর: দুপুর গড়িয়ে বিকেল
হয়ে এসেছিল।
৫৭. শাবলতলার মাঠে রোদ কেমন ছিল?
উত্তর: ঝাঁ ঝাঁ করছিল রোদ্দুর।
৫৮. শাবলতলার মাঠ দেখে লেখকের কীসের
মতো মনে হয়েছিল?
উত্তর: সমুদ্রের মতো ধু
ধু করছে, যার কোনো কূলকিনারা নেই।
৫৯. পরীক্ষার্থীদের কাঁধের বোঁচকার
মধ্যে কী কী জিনিস ছিল?
উত্তর: বই-দপ্তর, কাপড়,
গামছা ও কাঁথা।
৬০. পরীক্ষার্থীদের রানাঘাটে কোথায়
থাকার কথা ছিল?
উত্তর: হোটেলে।
৬১. ক্লান্ত হয়ে ছেলেরা শাবলতলার মাঠে
কোন্ গাছের তলায় বসেছিল?
উত্তর: একটি কুলগাছের তলায়।
৬২. কুলগাছের ফল সম্পর্কে সতু কী বলেছিল?
উত্তর: কুল হয়েছে, কিন্তু
ছোটো ছোটো বলে খাওয়া যায় না।
৬৩. কানাইয়ের মা তার জন্য পুঁটুলিতে
কী খাবার বেঁধে দিয়েছিলেন?
উত্তর: নারকেলের নাড়ু আর
রুটি।
৬৪. কানাইয়ের কাছ থেকে কে খাবার চেয়ে
নিয়ে খেয়েছিল?
উত্তর: সতু।
৬৫. লেখক খাবার চাইতে গেলে কানাই কী
বলেছিল?
উত্তর: “নেই” বলেছিল।
৬৬. বোঁচকা রেখে ছেলেরা মাঠের কোথায়
হুটোপাটি করে খেলা করছিল?
উত্তর: বনতুলসীর জঙ্গলে।
৬৭. শাবলতলার মাঠে খেলা করতে গিয়ে
লেখকের কেমন অনুভূতি হয়েছিল?
উত্তর: মনে হয়েছিল কোনো
নতুন রাজ্যে রূপকথার জগতে এসে পড়েছেন।
৬৮. শাবলতলার মাঠের বাতাসে কীসের সুবাস
মিশে ছিল?
উত্তর: তুলসীমঞ্জুরীর সুগন্ধ।
৬৯. শাবলতলার মাঠের ঝোপে কোন্ কোন্
পাখির কলরব শোনা যাচ্ছিল?
উত্তর: শালিক আর ছাতারে
পাখির।
৭০. মাঠের বেলে জমিতে কাদের গর্ত ছিল?
উত্তর: খেঁকশেয়ালের গর্ত।
৭১. রাঙা কেলেকোঁড়া ফুলের লতা কোন্
কোন্ গাছকে জড়িয়ে উঠেছিল?
উত্তর: বুনো কলুচটকা আর
তিত্তিরাজ গাছকে।
৭২. শাবলতলার মাঠে কোনো মানুষের বসতি
বা ফলের গাছ না থাকা সত্ত্বেও লেখকের কেমন লাগছিল?
উত্তর: অপূর্ব মুক্তির আনন্দ
লাগছিল।
৭৩. লেখকের মতে উমাচরণ মাস্টার কোন্
ধরনের জগতের মানুষ ছিলেন?
উত্তর: পুরোনো, একঘেয়ে ও
বালকদের পক্ষে মহা বিরক্তিকর জগতের মানুষ।
৭৪. হঠাৎ সতু কী লক্ষ্য করে উদ্বিগ্ন
হয়েছিল?
উত্তর: মাস্টারমশাই গাছতলায়
নেই দেখে।
৭৫. ছেলেরা শাবলতলার মাঠে কতক্ষণ ধরে
অবস্থান করছিল?
উত্তর: দু ঘণ্টার ওপর।
৭৬. ট্রেন ধরার তাড়া না থাকায় লেখক
কেন খুশি ছিলেন?
উত্তর: উচ্চ প্রাইমারি পরীক্ষার
বিভীষিকা এড়ানো যাবে ভেবে।
৭৭. স্কুল ইন্সপেক্টর রানাঘাটের পরীক্ষা
সম্পর্কে কী সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন?
উত্তর: খাতায় লিখে পরীক্ষা,
কড়া গার্ড থাকবে এবং দেখাদেখি করলে হাকিম জেল বা জরিমানা করবেন।
৭৮. পরীক্ষার হলে ছেলেদের কীভাবে ঢুকতে
হবে বলে লেখকের মনে হয়েছিল?
উত্তর: নবমীর পাঁঠার মতো
কাঁপতে কাঁপতে।
৭৯. শাবলতলার মাঠ দেখে লেখক জীবনের
কী সার্থকতা খুঁজে পেয়েছিলেন?
উত্তর: বিশাল মুক্ত প্রান্তরে
অবাধ স্বাধীনতা ও শান্তির মধ্যে ঘুরে বেড়ানোই জীবনের পরম সার্থকতা।
৮০. মাস্টারমশাইকে না পেয়ে সতু ভীতুমুখে
কী আশঙ্কা করেছিল?
উত্তর: বাঘে নিয়ে গেল কি
না।
৮১. সতুর বাঘের আশঙ্কার উত্তরে কানাই
কী যুক্তি দিয়েছিল?
উত্তর: এখানে মানুষ-খেকো
বাঘ থাকবে না।
৮২. মাস্টারমশাইকে খোঁজার পরিবর্তে
লেখক কী করতে চেয়েছিলেন?
উত্তর: মাঠে খেলা করতে চেয়েছিলেন।
৮৩. মাস্টারমশাইয়ের সন্ধান কে প্রথম
এনে দিয়েছিল?
উত্তর: সারদা।
৮৪. উমাচরণ মাস্টার কোথায় বসেছিলেন?
উত্তর: একটা শুকনো খাল-মতো
নীচু জায়গায় কুঁচঝোপের আড়ালে।
৮৫. কুঁচঝোপের আড়ালে বসে মাস্টারমশাই
কী করছিলেন?
উত্তর: ঝুঁকে পড়ে খাতা-কলমে
লিখতে লিখতে বিড়বিড় করছিলেন ও ফিক ফিক করে হাসছিলেন।
৮৬. মাস্টারমশাইয়ের লেখার তন্ময়তা
দেখে প্রথম দেখায় কী মনে হতে পারে?
উত্তর: উন্মাদ বা পাগল।
৮৭. মাস্টারমশাইকে উন্মত্তের মতো লিখতে
দেখে সতু ও সারদা কী মন্তব্য করেছিল?
উত্তর: “মাস্টারমশাই একজন
আসল কবি।”
৮৮. মাস্টারমশাইকে ডাকতে ছেলেরা কেন
সাহস পাচ্ছিল না?
উত্তর: কবির গভীর সাহিত্যসাধনায়
বিঘ্ন ঘটবে ভেবে সম্ভ্রমে ও ভয়ে।
৮৯. মাস্টারমশাইয়ের মনোযোগ আকর্ষণ
করতে সারদা কী করেছিল?
উত্তর: সজোরে উপস্থিতি-জ্ঞাপক
কাশির আওয়াজ করেছিল।
৯০. চমকে পেছন ফিরে মাস্টারমশাই কী
প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন?
উত্তর: অপ্রতিভের হাসি হেসে
বলেছিলেন— “তাই তো, বেলা গিয়েছে দেখছি।”
৯১. মাস্টারমশাই মাঠের জায়গাটি সম্পর্কে
কী মুগ্ধ মন্তব্য করেছিলেন?
উত্তর: “চমৎকার সিনারি ওখানটাতে।
কবিতা লিখছিলাম।”
৯২. মাস্টারমশাইয়ের প্রশংসায় লেখকের
মনে কী উপলব্ধি হয়েছিল?
উত্তর: লেখক নিজের মাঠ ভালো
লাগার সমর্থনে এক নতুন দৃষ্টি ও আনন্দ পেয়েছিলেন।
৯৩. গল্পের শেষে লেখক উমাচরণ মাস্টারের
স্মৃতিকে কত বছর আগের বলে উল্লেখ করেছেন?
উত্তর: প্রায় ত্রিশ-বত্রিশ
বছর আগের।
৯৪. বড়ো হয়ে লেখক কি সাহিত্যজগতে উমাচরণ
চক্রবর্তীর নাম শুনেছিলেন?
উত্তর: না, কোনো বই পড়েননি
বা নামও শোনেননি।
৯৫. উমাচরণবাবুর নাম না শোনা সত্ত্বেও
লেখকের আফশোস ছিল না কেন?
উত্তর: কারণ যশোভাগ্য সকলের
সমান থাকে না।
৯৬. শাবলতলার মাঠ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায়
লেখকের মনের অবস্থা কেমন হয়েছিল?
উত্তর: গভীর দুঃখ হয়েছিল
এবং সৌন্দর্য ও নির্জনতা হারানোর বেদনায় মন কেমন করে উঠেছিল।
৯৭. বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম
কোন্ জেলায় হয়েছিল?
উত্তর: চব্বিশ পরগনার বনগাঁওয়ে
(মুরাতিপুর গ্রাম)।
৯৮. বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত
উপন্যাস 'পথের পাঁচালী' কোথায় বসে লেখা?
উত্তর: ভাগলপুরে।
৯৯. বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা
দিনলিপি জাতীয় গ্রন্থগুলির দুটি নাম লেখো।
উত্তর: ‘উৎকর্ণ’ ও ‘স্মৃতির
রেখা’ (বা ‘অভিযাত্রিক’)।
১০০. বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় কত
সালে মরণোত্তর রবীন্দ্র পুরস্কারে ভূষিত হন?
উত্তর: ১৯৫১ সালে।
বিভাগ খ: সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক
প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৩) — [৫০টি]
১. “অনেক দিন পরে শাবলতলার মাঠ দেখলাম
সেদিন।” — লেখক কতদিন পর এবং কোন্ পরিস্থিতিতে মাঠটি দেখেছিলেন?
উত্তর: লেখক শৈশবে দুর্গাপুর
পাঠশালায় পড়ার প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ বছর পর মাঠটি দেখেছিলেন। পিসিমার মৃত্যুর পর তিনি
আর সে অঞ্চলে যাননি। বহু বছর পর গোরুর গাড়িতে চড়ে পিসিমার গ্রামের পাশের এক গ্রামে
মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ খুঁজতে যাওয়ার পথে তিনি আকস্মিকভাবে শাবলতলার মাঠটি দেখতে পান।
২. “এ কী হলো? আমার সেই ছেলেবেলাকার
শাবলতলার মাঠ কোথায় গেল?” — লেখকের এই বিস্ময়ের কারণ কী?
উত্তর: শৈশবে লেখক শাবলতলার
মাঠকে দেখেছিলেন বনতুলসী, কুলগাছ আর নির্জনতায় ভরা দিগন্তবিস্তৃত এক উন্মুক্ত প্রান্তর
হিসেবে। কিন্তু বহুকাল পর ফিরে এসে তিনি দেখেন সেই সবুজ রূপকথার মাঠ নেই; তার বদলে
সেখানে ইটখোলা, পাথুরে কয়লার স্তূপ, বড়ো কারখানা, রেল লাইন এবং লরির কোলাহল চেপে বসেছে।
এই আকস্মিক যান্ত্রিক পরিবর্তন দেখেই তিনি স্তম্ভিত হন।
৩. শাবলতলার মাঠে কারখানা তৈরির জন্য
কী কী পরিবর্তনের চিত্র লেখকের চোখে পড়েছিল?
উত্তর: মাঠের ওপর দিয়ে বড়ো
রেল লাইন পাতা হয়েছিল, কুলিমজুর ও অফিসারদের সারি সারি তাঁবু ও চালাঘর গড়ে উঠেছিল।
ইট-কাঠ বোঝাই লরির ভিড়, পাঞ্জাবি কন্ট্রাকটরের গাড়ি, তারের খুঁটি এবং বাতাসে ওড়া চুন
ও সিমেন্টের ধুলো দিয়ে মাঠের প্রাকৃতিক রূপ ধ্বংস করে এক ব্যস্ত শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা
হচ্ছিল।
৪. শাবলতলার মাঠে শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার
ফলে গ্রামীণ জনজীবনের কোন্ বিপর্যয় ঘটেছিল?
উত্তর: কলকারখানা স্থাপনের
আগ্রাসনে বহু প্রাচীন গ্রাম পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। বাজিতপুর, মনসাতলা, ছাওয়াল-মারি,
বেদে-পোতা এবং হাঁসখালির চড়া পর্যন্ত সমস্ত জনপদ ও গ্রামবাসীদের বাস্তুচ্যুত করে উচ্ছেদ
করে দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে গ্রামীণ জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
৫. দুর্গাপুর পাঠশালার প্রধান পণ্ডিত
উমাচরণ মাস্টারের বাসস্থানের বর্ণনা দাও।
উত্তর: উমাচরণ মাস্টার গ্রামের
রায় জমিদারদের ভাঙা কার্নিসে পায়রার বাসাওলা বৈঠকখানার একপাশে একটি সেকেলে তক্তপোশে
বাস করতেন। দেয়ালে পেরেকের গায়ে তাঁর হুঁকো ঝুলত, বাঁশের আলনায় ঝুলত দুখানা আধময়লা
ধুতি ও একটিমাত্র পিরান এবং তক্তপোশের নিচে কাঠের খড়ম, তোরঙ্গ ও বেত থাকত।
৬. উমাচরণ মাস্টারের তক্তপোশের নিচে
কী কী জিনিস রক্ষিত ছিল?
উত্তর: মাস্টারমশায়ের তক্তপোশের
নিচে ছিল একজোড়া কাঠের খড়ম, একটি পুরোনো বিবর্ণ টিনের তোরঙ্গ, টুকিটাকি জিনিসভর্তি
চটের একটি থলে, একখানা পাকা বাঁশের লাঠি এবং ছাত্রদের শাসনের জন্য সযত্নে রক্ষিত একগাছা
তেলে-জলে পাকানো বেত।
৭. উমাচরণ মাস্টারের শারীরিক অবয়ব
ও পড়ানোর ভঙ্গি কেমন ছিল?
উত্তর: মাস্টারমশাই ছিলেন
দীর্ঘ গোঁফওয়ালা এবং বসন্তের দাগে ভরা প্রৌঢ় চেহারার অধিকারী। ক্লাসে পড়ানোর সময় তিনি
টেবিলের ওপর পা তুলে দিয়ে গম্ভীর মুখে নিজের লেখা প্রহসন পাঠ করতেন, যা দেখে ছাত্ররা
ভক্তি ও প্রশংসার দৃষ্টিতে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত।
৮. “গোবরডাঙার সেজোবাবুর শালা কী বলেছিলেন
জান?” — সেজোবাবুর শালা কী বলেছিলেন এবং কেন?
উত্তর: সেজোবাবুর শালা উমাচরণ
মাস্টারের লেখা ‘আক্কেল গুড়ুম’ প্রহসন পড়ে বলেছিলেন— “উমাচরণবাবু, আপনি কালে গিরিশ
ঘোষের সমান লেখক হবেন।” মাস্টারমশাই তাঁর এই সাহিত্যিক প্রশংসাকে নিজের চরম গৌরব বলে
মনে করতেন এবং ছাত্রদের কাছে সগর্বে তা উল্লেখ করে আত্মপ্রসাদ লাভ করতেন।
৯. “গিরিশ ঘোষ কে পণ্ডিত মশাই?” —
লেখকের এই প্রশ্নের উত্তরে উমাচরণ মাস্টার কী করেছিলেন?
উত্তর: লেখকের এহেন অজ্ঞতাসূচক
প্রশ্নে উমাচরণ মাস্টার মুখে কৃপার হাসি ফুটিয়ে তুলেছিলেন। তিনি অবাক হয়ে তাচ্ছিল্যের
সুরে বলেছিলেন— “গিরিশ ঘোষ? জান না? কী-বা জান?” লেখকের বালকোচিত অজ্ঞতায় তিনি ব্যথিত
ও বিস্মিত হয়ে তাঁকে অপ্রস্তুত করে দিয়েছিলেন।
১০. স্কুলের মাইনে আদায়ের ক্ষেত্রে
উমাচরণ মাস্টারের অদ্ভুত রীতিটি কী ছিল?
উত্তর: মাস্টারমশায়ের কাছে
ছাত্ররা স্কুলের মাইনের টাকা দিলে তিনি কোনো খুচরো পয়সা ফেরত দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন
না। বাকি পয়সা বা খুচরোর বদলে তিনি নিজের লেখা অমূল্য সাহিত্যকর্ম ‘আক্কেল গুড়ুম’ প্রহসনের
একখানা বই ছাত্রদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বাড়ি গিয়ে সবাইকে পড়তে বলতেন।
১১. “যেমন পোড়ারমুখো মাস্টার তেমনই
পোড়ারমুখো ছেলে!” — পিসিমা কেন এমন ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন?
উত্তর: পিসিমা লেখককে মাইনে
দিয়ে বাকি ন আনা পয়সা ফেরত আনতে বলেছিলেন। কিন্তু লেখক পয়সার বদলে উমাচরণ মাস্টারের
লেখা ‘আক্কেল গুড়ুম’ বইটি নিয়ে বাড়ি ফেরায় পিসিমা ক্ষুব্ধ হন। সংসারের প্রয়োজনের বদলে
অবান্তর একটি প্রহসন বই কেনায় তিনি মাস্টার ও ছাত্র উভয়কেই তিরস্কার করেন।
১২. পিসিমা ‘আক্কেল গুড়ুম’ বইটির পরিবর্তে
কোন্ বই ফিরিয়ে আনতে বলেছিলেন এবং কেন?
উত্তর: পিসিমা ‘কেষ্টর শতনাম’
বইটি আনতে বলেছিলেন। কারণ এক পাড়াগাঁয়ের দরিদ্র গৃহস্থ নারীর কাছে আধ্যাত্মিক নামমাহাত্ম্যের
বই ‘কেষ্টর শতনাম’-এর পাঠই ছিল পুণ্য ও মঙ্গলজনক; প্রহসন বা সাহিত্যচর্চার অদ্ভুত বিষয়বস্তু
তাঁর কাছে ছিল সম্পূর্ণ অর্থহীন ও অদরকারি।
১৩. “ওসব গিরিশ ঘোষ সতীশ ঘোষ বুঝি
নে...” — পিসিমার এই সংলাপের মাধ্যমে তাঁর কোন্ মানসিকতা প্রকাশ পায়?
উত্তর: এই উক্তির মাধ্যমে
গ্রামবাংলার চিরাচরিত বাস্তববাদী, নিরক্ষর ও ধর্মপ্রাণ সাধারণ নারীর মানসিকতা প্রকাশ
পায়। নাট্যজগতের দিকপাল গিরিশ ঘোষ বা সাহিত্যিক পাণ্ডিত্য তাঁর কাছে অর্থহীন ছিল; সংসারের
বাস্তব অর্থ এবং কৃষ্ণনামের ধার্মিক মূল্যই ছিল তাঁর কাছে একমাত্র বিবেচ্য।
১৪. “বড়ো বড়ো লেখকরা সবাই প্রথম জীবনে
তাঁর মতো ইস্কুল-মাস্টারি করেছিলেন।” — উমাচরণ মাস্টারের এই ধারণার তাৎপর্য কী?
উত্তর: উমাচরণ মাস্টার গ্রাম্য
পাঠশালার স্বল্প বেতনের শিক্ষক হলেও তাঁর মনের গভীরে বড়ো সাহিত্যিক হওয়ার তীব্র বাসনা
ছিল। নিজেকে তিনি অবহেলিত ভাবতেন না; বরং সাহিত্যের ইতিহাসের বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের
সঙ্গে তুলনা টেনে নিজের বর্তমান শিক্ষকতা জীবনের মধ্যে ভবিষ্যৎ মহাকবির সম্ভাবনার সান্ত্বনা
খুঁজতেন।
১৫. “আপনার বয়স কত মাস্টারমশাই?”
— ছাত্র সারদার এই প্রশ্নের অন্তর্নিহিত কারণ কী ছিল?
উত্তর: মাস্টারমশাই যখন
দাবি করেছিলেন যে বড়ো লেখকরা প্রথম জীবনে মাস্টারি করতেন, তখন বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন
বালক সারদা লক্ষ্য করে মাস্টারের বয়স ইতিমধ্যে প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে গেছে। তাই তার মনে প্রশ্ন
জেগেছিল— জীবনের এতখানি পেরিয়ে এখনও যদি মাস্টারি করতে হয়, তবে তিনি আর কোন্ বয়সে গিয়ে
বড়ো কাজ করবেন?
১৬. চালতেবাগানের প্রাকৃতিক পরিবেশটি
লেখক কীভাবে বর্ণনা করেছেন?
উত্তর: চালতেবাগানটি ছিল
বহুকালের প্রাচীন আম ও তেঁতুল গাছের ঘন ছায়ায় ঘেরা এক নিবিড় বনভূমি। গাছের ডালপালায়
জড়িয়ে থাকা মোটা লতাপাতার কারণে ভরদুপুরেও সেখানে সন্ধ্যার মতো অন্ধকার বিরাজ করত।
বাগানটি পার হলেই শুরু হতো একটি শান্ত, নিভৃত মাঠ।
১৭. চালতেবাগানের প্রান্তে উমাচরণ
মাস্টারের লেখালেখির দৃশ্যটি বর্ণনা করো।
উত্তর: মাস্টারমশাই চালতেবাগানের
ছায়ায় একটি ছেঁড়া মাদুর পেতে বসতেন। চারদিকে ছড়ানো খাতা-কাগজের ওপর মাটির ঢেলা চাপা
দেওয়া থাকত। তিনি কখনও উপুড় হয়ে খাতায় লিখতেন, কখনও দূর দিগন্তে চেয়ে ভাবতেন, আবার
কখনও আপনমনে ফিক ফিক করে হাসতেন ও বিড়বিড় করতেন।
১৮. “দেখলি? কবিমানুষ!” — সতু কেন
এ কথা বলেছিল?
উত্তর: সতু ও লেখক ঝোপের
আড়াল থেকে দেখেছিলেন মাস্টারমশাই নিভৃতে বসে আপনমনে লিখছেন, হাসছেন ও বিড়বিড় করে বকছেন।
সাধারণ মানুষের কাছে যা উন্মাদনা বলে মনে হতে পারে, সতুর চোখে সেটাই ছিল ভাবুক কবির
স্বভাবসুলভ ভাবাবেগ। তাই সে সম্ভ্রমের সঙ্গে লেখককে কবির এই লক্ষণ বুঝিয়ে দিয়েছিল।
১৯. “এই আমার জীবনে প্রথম একজন জীবন্ত
কবির ক্রিয়াকলাপ দেখবার দুর্লভ সৌভাগ্য ঘটল।” — কবির কোন্ কোন্ আচরণ লেখককে মুগ্ধ করেছিল?
উত্তর: মাস্টারমশায়ের একাগ্র
তন্ময়তা, নির্জন প্রকৃতির কোলে বসে খাতা-কলম নিয়ে কল্পনার সাগরে ডুব দেওয়া এবং নিজের
লেখার আনন্দে আপনমনে বিড়বিড় করে হাসার অপূর্ব দৃশ্য বালকের মনে গভীর বিস্ময় জাগিয়েছিল।
বাস্তব জগতের বাইরে এই সৃষ্টিশীল উন্মাদনা লেখককে অভিভূত করেছিল।
২০. চালতেবাগানে কতবেল খাওয়ার লোভ
লেখক কেন সংবরণ করেছিলেন?
উত্তর: শ্যাওড়া ঝোপের পাশে
কতবেল গাছের নিচে অজস্র সুপক্ক সুগন্ধি কতবেল পড়ে থাকলেও লেখকের শৈশবের স্বাভাবিক লোভ
স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। চোখের সামনে একজন ‘জীবন্ত কবি’র সৃষ্টিশীল কাজকর্ম স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ
করার যে দুর্লভ আনন্দ ও বিস্ময় তাঁকে আবিষ্ট করেছিল, তার কাছে কতবেলের আকর্ষণ তুচ্ছ
হয়ে পড়েছিল।
২১. উমাচরণ মাস্টারের বয়স যে চল্লিশের
বেশি ছিল, সে বিষয়ে লেখকের কী প্রমাণ ছিল?
উত্তর: লেখকের নিজের মায়ের
বড়ো ভাই অর্থাৎ তাঁর বড়ো মামার বয়স তখন ছিল পঁয়ত্রিশ বছর। সেই বড়ো মামা স্বয়ং উমাচরণ
মাস্টারকে বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে মান্য করে ‘দাদা’ বলে সম্বোধন করতেন। এই পারিবারিক সম্পর্কের
হিসাব থেকেই লেখক নিশ্চিত হয়েছিলেন মাস্টারের বয়স চল্লিশের ঊর্ধ্বে।
২২. উচ্চ প্রাইমারি পরীক্ষা দেওয়ার
জন্য দুর্গাপুর স্কুল থেকে কারা এবং কীভাবে রানাঘাটে রওনা হয়েছিল?
উত্তর: উমাচরণ মাস্টারের
নেতৃত্বে চারজন ছাত্র— চক্কত্তিদের কানাই, লেখক স্বয়ং, সতু ও সারদা রানাঘাটে যাচ্ছিল।
প্রত্যেকের কাঁধে ছিল বই-খাতা, কাপড়, গামছা ও কাঁথাসমেত কাপড়ের বোঁচকা। তারা দুর্গাপুর
থেকে পায়ে হেঁটে রানাঘাটের ট্রেন ধরার উদ্দেশ্যে শাবলতলার মাঠের দিকে রওনা হয়েছিল।
২৩. শাবলতলার মাঠের বিস্তার ও বুনো
প্রকৃতির বর্ণনা দাও।
উত্তর: শাবলতলার মাঠটি ছিল
দুর্গাপুর থেকে আড়াই ক্রোশ দূরে অবস্থিত সমুদ্রের মতো কূলকিনারাহীন বিশাল এক প্রান্তর।
মাথার ওপর ছিল ঝাঁ ঝাঁ করা রোদ, আর মাঠময় ছিল কুলগাছ, শ্যাওড়া-ডাঁটা, বনতুলসীর জঙ্গল,
খেঁকশেয়ালের গর্ত এবং কলুচটকা গাছে জড়িয়ে থাকা লাল কেলেকোঁড়া ফুলের লতা।
২৪. “আমরা বোঁচকা নামিয়ে একটা কুলগাছের
তলায় সবাই বসলাম।” — গাছতলায় বসে ছেলেরা কী করেছিল?
উত্তর: ক্লান্ত ছেলেরা কুলগাছের
তলায় বোঁচকা নামিয়ে বিশ্রাম নিয়েছিল। সতু গাছে কোনো খাবার উপযোগী পাকা কুল আছে কি না
তা পরীক্ষা করেছিল এবং কানাইয়ের মার দেওয়া পুঁটুলি থেকে নারকেলের নাড়ু ও রুটি চেয়ে
নিয়ে খেয়েছিল।
২৫. “কানাই-এর মা ওকে সেখানে গিয়ে
খাবার জন্যে নারকেলের নাড়ু আর রুটি করে দিয়েছিলেন...” — এই ঘটনায় কানাইয়ের আচরণ কেমন
ছিল?
উত্তর: কানাই নিজের খাবার
সতু চাইতে সতুকে কিছুটা ভাগ করে দিয়েছিল। কিন্তু লেখক যখন কানাইয়ের কাছে একটু নাড়ু
বা রুটি চেয়েছিলেন, তখন কানাই সোজাসুজি জানিয়ে দিয়েছিল— “নেই”। বালকোচিত এই কৃপণতা
ও পার্থক্যের বাস্তব চিত্র লেখক সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।
২৬. বনতুলসীর জঙ্গলে খেলা করার সময়
লেখকের কেমন অনুভূতি হয়েছিল?
উত্তর: ক্ষুদ্র গ্রামের
চারদেওয়াল আর শাসনমুক্ত এমন দিগন্তজোড়া ফাঁকা জায়গায় লেখক আগে কখনও আসেননি। বনতুলসীর
মঞ্জরীর বুনো সুবাসে এবং উন্মুক্ত প্রান্তরের বাতাসে লেখকের মনে হয়েছিল তিনি যেন রূপকথার
কোনো অচেনা, অবাধ স্বাধীন রাজ্যে প্রবেশ করেছেন।
২৭. “উমাচরণ মাস্টার সেই পুরোনো, একঘেয়ে,
বালকের পক্ষে মহা বিরক্তিকর জগতের মানুষ...” — লেখক কেন এমন তুলনা করেছেন?
উত্তর: উমাচরণ মাস্টার ছিলেন
পাঠশালার নিরানন্দ পড়ালেখা, কঠিন শাসন এবং পরীক্ষার মতো বাস্তব বাধ্যবাধকতার প্রতীক।
কিন্তু শাবলতলার মাঠ ছিল মুক্তির, অনন্ত অবকাশের ও আনন্দের প্রতীক। সেই বাঁধনহারা প্রাকৃতিক
মুক্তির আনন্দের মাঝে মাস্টারের গুরুগম্ভীর অনুশাসনের কোনো স্থান ছিল না।
২৮. “ইস্পেক্টর এসে সেবার স্কুলে বলে
গিয়েছিল...” — স্কুল ইন্সপেক্টর রানাঘাটের পরীক্ষা সম্পর্কে কী আতঙ্ক তৈরি করেছিলেন?
উত্তর: ইন্সপেক্টর বলেছিলেন
রানাঘাটে খাতায় লিখে কড়া গার্ডের সামনে পরীক্ষা দিতে হবে। সামান্যতম দেখাদেখি বা ফিসফাস
করলেই পরীক্ষার্থীদের মহকুমা হাকিমের সামনে হাজির করা হবে এবং হাকিম তাদের জেল বা জরিমানা
পর্যন্ত করতে পারেন। এই কথা বালকদের মনে চরম ভীতি তৈরি করেছিল।
২৯. “নবমীর পাঁটার মতো কাঁপতে কাঁপতে
ঢুকতে হবে হলঘরে।” — এই উপমার তাৎপর্য কী?
উত্তর: বলি দেওয়ার পূর্বে
নবমীর পাঁঠার যে চরম অসহায় ও আতঙ্কিত অবস্থা হয়, দুর্গাপুরের পাড়াগাঁয়ের নিরীহ বালকদের
ক্ষেত্রে পরীক্ষার হলঘরে প্রবেশের মানসিক অবস্থাকে লেখক তারই সঙ্গে তুলনা করেছেন। পুঁথিগত
পরীক্ষার নির্মম ভীতি বোঝাতেই এই জোরালো উপমা ব্যবহৃত হয়েছে।
৩০. পরীক্ষার ভয়ের বিপরীতে শাবলতলার
মাঠে লেখকের জীবনের কোন্ সার্থকতা ধরা পড়েছিল?
উত্তর: পরীক্ষা দিয়ে পাস
করে সামাজিক সাফল্য পাওয়ার চেয়েও প্রকৃতির অবারিত উন্মুক্ত প্রান্তরে ধুলোমাটি উড়িয়ে
ঘুরে বেড়ানো এবং বাঁধাহীন স্বাধীনতার শান্তিময় স্পর্শ লাভ করাই ছিল লেখকের কাছে জীবনের
পরম সার্থকতা। তিনি বুঝেছিলেন কৃত্রিম শিক্ষার চেয়ে প্রকৃতির পাঠ অনেক বেশি জীবন্ত।
৩১. “বাঘে নিয়ে গেল নাকি রে?” — সতু
কেন এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল?
উত্তর: দু ঘণ্টারও বেশি
সময় ধরে শাবলতলার মাঠে কাটানোর পর হঠাৎ দেখা যায় উমাচরণ মাস্টার কুলগাছতলায় নেই। চারদিকে
জনমানবহীন ধু ধু মাঠ, ক্রমশ নেমে আসা অন্ধকার এবং বুনো প্রান্তরের নিঃসীম নির্জনতা
দেখে সতু ভয় পেয়ে ভেবেছিল নির্ঘাত কোনো মানুষখেকো বাঘে মাস্টারমশাইকে তুলে নিয়ে গেছে।
৩২. মাস্টারমশাই হারিয়ে যাওয়ার পর
ছেলেদের বিভিন্ন জনের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
উত্তর: সতু বাঘের ভয়ে আতঙ্কিত
হয়ে চেঁচিয়ে ডাকতে শুরু করেছিল; কানাই যুক্তি দিয়েছিল যে এখানে বাঘ নেই এবং ডাকতে চেয়েছিল;
সারদা মাস্টারকে খুঁজতে এগিয়ে গিয়েছিল; আর লেখক সবকিছু ভুলে একা একা মাঠের বুনো আনন্দে
খেলায় মেতে থাকতে চেয়েছিলেন।
৩৩. সারদা কীভাবে মাস্টারমশাইকে খুঁজে
বের করেছিল এবং তাদের কীভাবে নিয়ে গিয়েছিল?
উত্তর: মাস্টারমশাইকে খুঁজতে
খুঁজতে সারদা একটি শুকনো খালের মতো জায়গায় তাঁকে দেখতে পায়। তারপর সে দ্রুত ফিরে এসে
বাকিদের ইশারা করে এবং আঙুল দিয়ে জায়গাটি দেখিয়ে সবাইকে পা টিপে টিপে নিঃশব্দে খালের
কাছে নিয়ে যায়।
৩৪. শুকনো খালের নিচে কুঁচঝোপের আড়ালে
মাস্টারমশাইকে ছেলেরা কী অবস্থায় দেখেছিল?
উত্তর: মাস্টারমশাই কুঁচঝোপের
আড়ালে একমনে ঝুঁকে পড়ে খাতায় লিখছিলেন। লিখতে লিখতে তিনি আপনমনে বিড়বিড় করছিলেন এবং
একাকী ফিক ফিক করে হাসছিলেন। তাঁর এই গভীর নিমগ্নতা প্রথম দর্শনে পাগলের মতো মনে হলেও
তা ছিল সৃষ্টির পরম আনন্দ।
৩৫. মাস্টারমশাইকে লেখার মধ্যে বিভোর
দেখে সতু ও সারদার ধারণা কীভাবে বদলে গিয়েছিল?
উত্তর: স্কুলের কড়া ও সাধারণ
উমাচরণ মাস্টার যে নিছক এক গ্রাম্য শিক্ষক নন, বরং প্রকৃত অর্থেই এক তন্ময় সাধক ও সত্যিকারের
‘আসল কবি’— তাঁর এই ধ্যানমগ্ন রূপ দেখে সতু ও সারদা পরম মুগ্ধতা ও শ্রদ্ধায় তা নিঃসংশয়ে
মেনে নিয়েছিল।
৩৬. কবির ধ্যান ভাঙাতে ছেলেরা কেন
প্রথমে ইতস্তত করছিল এবং শেষ পর্যন্ত কী করা হয়েছিল?
উত্তর: কবির এই দুর্লভ ভাবাবেশ
ও তন্ময়তায় ব্যাঘাত ঘটাতে ছেলেদের সমীহ ও ভয় হচ্ছিল। কিন্তু সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল এবং
ট্রেন ধরতে হবে, তাই সারদা কৌশলে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার জন্য সজোরে কয়েকবার
কাশির ভান করেছিল।
৩৭. কাশির শব্দে চমকে ওঠার পর মাস্টারমশাই
কী রূপ প্রকাশ পেয়েছিল?
উত্তর: মাস্টারমশাই চমকে
পেছনে ফিরে যখন বাস্তব পরিস্থিতি ও ছেলেদের দেখতে পান, তখন তিনি অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন।
তিনি এক লাজুক ও অপ্রতিভের হাসি হেসে তাড়াতাড়ি খাতাপত্র বগলে গুটিয়ে নেন এবং বেলা যে
অনেক গড়িয়ে গেছে তা স্বীকার করে নেন।
৩৮. “সে কী তুই বুঝবি? সিনারি কাকে
বলে জানিস?” — মাস্টারমশায়ের এই ধমকের পেছনে কোন্ সত্য লুকিয়ে ছিল?
উত্তর: উপরের দৃষ্টিতে ধমক
মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে ছিল প্রকৃতির অপরূপ রূপের প্রতি একজন সংবেদনশীল মানুষের গভীর
ভালোবাসা। শাবলতলার বুনো সৌন্দর্য বা ‘সিনারি’ মাস্টারের সংবেদনশীল হৃদয়কে এতটাই আলোড়িত
করেছিল যে তিনি সামাজিক দায়িত্ব ও সময়ের হুঁশ হারিয়ে ফেলেছিলেন।
৩৯. মাস্টারমশায়ের মুখের কথায় লেখক
কেন গভীর আনন্দ ও নতুন দৃষ্টি পেয়েছিলেন?
উত্তর: শাবলতলার বুনো মাঠের
সৌন্দর্য লেখকের নিজের মনেও গভীর আনন্দের সঞ্চার করেছিল, কিন্তু তা ঠিক কি না তিনি
নিশ্চিত ছিলেন না। মাস্টারমশাইও যখন সেই একই অনুভূতি প্রকাশ করে মাঠটিকে চমৎকার বললেন,
তখন লেখক নিজের শৈশব-উপলব্ধির এক পরম স্বীকৃতি খুঁজে পেয়েছিলেন।
৪০. “উমাচরণ মাস্টার কত বড়ো শিক্ষকের
কাজ করলেন সেদিন তিনি নিজেও কি তা বুঝলেন?” — এই উক্তির তাৎপর্য কী?
উত্তর: একজন শিক্ষক কেবল
বইয়ের মুখস্থ বিদ্যা বা পরীক্ষার ব্যাকরণ শেখান না; জীবনের আসল শিক্ষা হলো প্রকৃতির
সৌন্দর্য ও আত্মিক স্বাধীনতাকে ভালোবাসতে শেখা। অবচেতনভাবেই মাস্টারমশাই সেদিন ছাত্রদের
মনে প্রকৃতির এই মুক্তির বীজ বুনে দিয়ে একজন প্রকৃত শিক্ষকের শ্রেষ্ঠ কাজ করেছিলেন।
৪১. বড়ো হয়ে লেখক উমাচরণ চক্রবর্তী
সম্পর্কে কী তথ্য জানতে পারেন?
উত্তর: বড়ো হয়ে লেখক বাংলা
সাহিত্যজগতের কোথাও ‘উমাচরণ চক্রবর্তী’ বলে কোনো বিখ্যাত কবির লেখা পড়তে পারেননি কিংবা
কারও মুখে তাঁর নামও শোনেননি। অর্থাৎ সাহিত্যিক হিসেবে তিনি বৃহত্তর সমাজে কোনো খ্যাতি
লাভ করতে পারেননি।
৪২. “যশোভাগ্য সকলের কি থাকে!” — লেখকের
এই মন্তব্যের গভীরতা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: সংসারে বহু মানুষ
অকৃত্রিম শিল্পপ্রেম ও প্রতিভা নিয়ে নীরবে সাধনা করে যান, কিন্তু জাগতিক খ্যাতি বা
সামাজিক যশ সবার ভাগ্যে জোটে না। উমাচরণ মাস্টার বিখ্যাত না হলেও তাঁর ভেতরের খাঁটি
কবিহৃদয়টি যে মিথ্যা ছিল না— লেখকের এই মন্তব্যে সেই জীবনের বাস্তব সত্যই প্রকাশিত
হয়েছে।
৪৩. বহু বছর পর শাবলতলার মাঠে ফিরে
লেখকের মনের মধ্যে কোন্ বেদনাবোধ জেগে উঠেছিল?
উত্তর: বহু বছর পর ফিরে
এসে লেখক দেখেন সেই সবুজ, স্নিগ্ধ ও নির্জন শাবলতলার মাঠ কলকারখানার বিষাক্ত ধুলো ও
যান্ত্রিকতায় ধ্বংস হয়ে গেছে। মাঠটির বিনাশের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শৈশবের স্মৃতি এবং উমাচরণ
মাস্টারের প্রতি এক গভীর বেদনামাখা শ্রদ্ধায় তাঁর মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।
৪৪. ‘শাবলতলার মাঠ’ গল্পে প্রকৃতি
কীভাবে মানুষের মুক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে?
উত্তর: পাঠশালার কঠিন শাসন,
সংকীর্ণ গ্রাম্য জীবন এবং পরীক্ষার নির্মম আতঙ্কের বিপরীতে শাবলতলার মাঠ ছিল সীমাহীন
মুক্ত আকাশ, বুনো বাতাস ও অবাধ স্বাধীনতার এক আশ্রয়। প্রকৃতির এই রূপই শৈশবের বন্দিদশা
থেকে মানুষের আত্মাকে মুক্ত করার প্রতীক।
৪৫. উমাচরণ মাস্টারের চরিত্রটি কি
হাসির, নাকি করুণার? যুক্তি দাও।
উত্তর: উমাচরণ মাস্টারের
চরিত্রটি বাহ্যিকভাবে একটু কৌতুকপূর্ণ ও হাসির— টেবিলের ওপর পা তুলে বই পড়া বা মাইনের
বদলে নিজের বই গছিয়ে দেওয়া। কিন্তু তাঁর অন্তরে ছিল দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে এক
অপূর্ণ কবিসত্তাকে লালন করার করুণ আর্তি, যা চরিত্রটিকে গভীর বেদনাময় মর্যাদায় ভূষিত
করে।
৪৬. গল্পে পিসিমার চরিত্রটি গ্রামীণ
সমাজের কোন্ বাস্তবতাকে তুলে ধরে?
উত্তর: পিসিমার চরিত্রটি
গ্রামীণ সংসারের কঠোর বাস্তববুদ্ধি ও ধর্মভীরুতার প্রতীক। কাব্য-সাহিত্যের মতো বিলাসিতার
চেয়ে সংসারে প্রতিটি পয়সার সঠিক ব্যবহার এবং আত্মিক শান্তির জন্য কৃষ্ণনামের মতো ধর্মচর্চাই
ছিল সাধারণ গ্রামীণ মানুষের মূল অবলম্বন।
৪৭. বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্য
রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: বিভূতিভূষণের সাহিত্যের
প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো গ্রামবাংলার নিবিড় পল্লী-প্রকৃতির মায়াবী রূপের নিখুঁত চিত্রায়ণ,
নির্জন বুনো প্রান্তরের প্রতি গভীর আকর্ষণ এবং দারিদ্র্যক্লিষ্ট গ্রামীণ মানুষের অন্তরের
সরল অনুভূতি ও আবেগের জীবন্ত প্রকাশ।
৪৮. ‘উপেক্ষিতা’ গল্পটি বিভূতিভূষণের
জীবনে কেন স্মরণীয়?
উত্তর: ‘উপেক্ষিতা’ গল্পটি
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যিক আত্মপ্রকাশের প্রথম সোপান। এটি তৎকালীন প্রখ্যাত
‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল এবং এই গল্পের মাধ্যমেই কথাসাহিত্যিক হিসেবে তাঁর
দীপ্ত পদচারণা শুরু হয়।
৪৯. বিভূতিভূষণের দিনলিপি জাতীয় গ্রন্থগুলির
নাম উল্লেখ করে তাদের সাহিত্যমূল্য নির্দেশ করো।
উত্তর: তাঁর দিনলিপি জাতীয়
গ্রন্থগুলি হলো ‘উৎকর্ণ’, ‘স্মৃতির রেখা’ ও ‘অভিযাত্রিক’। এগুলিতে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের
গভীর উপলব্ধি, গভীর অরণ্য ও প্রকৃতির পর্যবেক্ষণ এবং মানবজীবনের নিঃসঙ্গতা ও আধ্যাত্মিক
ভাবনার অনুপম প্রকাশ ঘটেছে।
৫০. ‘শাবলতলার মাঠ’ গল্পটির নামকরণের
সার্থকতা সংক্ষেপে লেখো।
উত্তর: সমগ্র গল্পটির স্মৃতিচারণা,
রূপবদল এবং আবেগ আবর্তিত হয়েছে ‘শাবলতলার মাঠ’কে কেন্দ্র করে। এই মাঠই একদিকে লেখকের
শৈশবের মুক্তির রূপকথা ও মাস্টারের কবিসত্তার সাক্ষী, আবার অন্যদিকে আধুনিক শিল্পায়নে
প্রকৃতি ধ্বংসের মূর্ত প্রতীক। তাই নামকরণটি সম্পূর্ণ সার্থক ও ব্যঞ্জনাময়।
বিভাগ গ: বিশ্লেষণধর্মী
ও বড়ো প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫) — [২০টি]
১. ‘শাবলতলার মাঠ’ গল্প অবলম্বনে শিক্ষক
উমাচরণ মাস্টারের চরিত্রটি বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের
‘শাবলতলার মাঠ’ গল্পের কেন্দ্রবিন্দু হলেন দুর্গাপুর উচ্চ প্রাইমারি পাঠশালার প্রধান
পণ্ডিত উমাচরণ মাস্টার। তাঁর চরিত্রের বহুস্তরীয় দিকগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
ক. সাদাসিধে ও দারিদ্র্যপীড়িত জীবন: গ্রামের রায় জমিদারদের ভাঙা বৈঠকখানার একপাশে তক্তপোশে
তাঁর নিঃসঙ্গ ও দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবন। দুখানা আধময়লা ধুতি, একটিমাত্র পিরান, খড়ম আর
টিনের তোরঙ্গ ছিল তাঁর সহায়-সম্বল।
খ. সাহিত্যপ্রেম ও আত্মমুগ্ধতা: দারিদ্র্য তাঁর সাহিত্যপ্রেমকে ম্লান করতে পারেনি।
তিনি ‘আক্কেল গুড়ুম’ নামে প্রহসন লিখেছিলেন। গোবরডাঙার সেজোবাবুর শালার একটি চাটুবাক্যকে
সত্য মেনে তিনি নিজেকে গিরিশ ঘোষের সমকক্ষ ভাবতেন এবং আত্মতৃপ্তিতে বিভোর থাকতেন।
গ. অদ্ভুত সরল দুর্বলতা: মাইনের টাকা থেকে খুচরো পয়সা ফেরত না দিয়ে নিজের বই বিক্রি
করার কৌশল তাঁর চরিত্রের এক গ্রাম্য সরল দুর্বলতাকে ফুটিয়ে তোলে, যা পাঠককে কৌতুক উপহার
দেয়।
ঘ. অন্তরের খাঁটি কবিসত্তা ও সৌন্দর্যানুরাগ: চালতেবাগানের ছায়ায় কিংবা শাবলতলার মাঠে
কুঁচঝোপের আড়ালে বসে পরীক্ষার তাড়া ভুলে প্রকৃতির ‘সিনারি’ দেখে কবিতা লেখার মধ্যে
তাঁর নির্ভেজাল শিল্পীমন ফুটে ওঠে। বাহ্যিক শাসন ও অখ্যাতির আড়ালে তিনি ছিলেন প্রকৃতির
এক প্রকৃত পূজারী।
২. শাবলতলার মাঠে উপস্থিত হয়ে বালকদল
ও লেখকের মনে যে ভাবান্তর ও প্রাকৃতিক মুক্তির অনুভূতি জেগেছিল, তা নিজের ভাষায় বর্ণনা
করো।
উত্তর: দুর্গাপুর থেকে আড়াই
ক্রোশ পথ রোদের মধ্যে হেঁটে যখন চার বালক— লেখক, সতু, কানাই ও সারদা শাবলতলার মাঠে
পৌঁছায়, তখন তাদের মনোজগতে এক বিস্ময়কর পরিবর্তন ঘটে:
ক. সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি: পাড়াগাঁয়ের সংকীর্ণ পরিমণ্ডলে বন্দি থাকা বালকদের কাছে দিগন্তবিস্তৃত
সমুদ্রের মতো বিশাল এই মাঠ ছিল সম্পূর্ণ অচেনা। বনতুলসীর মঞ্জরীর বুনো গন্ধ এবং উন্মুক্ত
প্রান্তরের হাওয়া তাদের মনে রূপকথার দেশের অনুভূতি এনে দিয়েছিল।
খ. শৈশবের বাধাহীন স্বাধীনতা: পাঠশালার বই-খাতা, রুটিন আর গুরুমশায়ের শাসন যেখানে নেই,
সেই উন্মুক্ত মাঠে ধুলো উড়িয়ে হুটোপাটি করে খেলা করায় তারা এক অনাবিল স্বাধীনতার স্বাদ
পেয়েছিল।
গ. পরীক্ষার আতঙ্কমুক্তি: রানাঘাটে হাকিমের জেল-জরিমানা আর কড়া গার্ডের যে ভয় তাদের
তাড়া করছিল, মাঠের উদার প্রকৃতির স্পর্শে তা নিমিষে মুছে যায়। লেখক অনুভব করেছিলেন
যে, কৃত্রিম পরীক্ষা দেওয়ার চেয়ে প্রকৃতির কোলে মুক্তভাবে বেঁচে থাকাটাই জীবনের প্রকৃত
সার্থকতা।
৩. ‘শাবলতলার মাঠ’ গল্পে গ্রামীণ প্রকৃতির
সঙ্গে আধুনিক শিল্পায়নের যে দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে, তা আলোচনা করো।
উত্তর: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের
প্রকৃতিচেতনার এক মর্মস্পর্শী দলিল হলো ‘শাবলতলার মাঠ’। গল্পে অতীতের স্নিগ্ধ প্রকৃতি
এবং বর্তমানের আগ্রাসী শিল্পায়নের বৈপরীত্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে:
ক. অতীতের শাবলতলার সবুজ রূপ: পঁচিশ-ত্রিশ বছর আগে শাবলতলার মাঠ ছিল প্রকৃতির এক শান্ত,
নির্জন ও বুনো লীলাভূমি। কুলগাছ, শ্যাওড়া-ডাঁটা, বনতুলসী, কেলেকোঁড়া ফুল আর শালিক-ছাতারের
কলতানে মুখরিত ছিল এই বিস্তীর্ণ প্রান্তর, যা মানুষকে আত্মিক শান্তি ও মুক্তি দিত।
খ. আধুনিক যন্ত্রসভ্যতার নির্মম আগ্রাসন: পঁচিশ বছর পর ফিরে এসে লেখক দেখেন সেই সবুজ
মাঠের বুকে বসেছে বড়ো কারখানা ও রেল লাইন। ইটখোলা, পাথুরে কয়লার স্তূপ, লরির ধোঁয়া
এবং বাতাসে ওড়া চুন-সিমেন্টের ধুলো দিয়ে প্রকৃতির বুককে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে।
গ. জনপদের উচ্ছেদ ও মানবিক ক্ষতি: কেবল গাছগাছালি নয়, কারখানার জন্য বাজিতপুর, মনসাতলা,
বেদে-পোতা ইত্যাদি জনপদগুলি চিরতরে ধ্বংস হয়ে গেছে। লেখক প্রগতির বিরোধিতা না করলেও
যান্ত্রিকতার চাপে প্রকৃতির চিরন্তন রূপ ও শান্তি চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার যে গভীর ট্র্যাজেডি,
তা সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
৪. “উমাচরণ মাস্টার কত বড়ো শিক্ষকের
কাজ করলেন সেদিন তিনি নিজেও কি তা বুঝলেন?” — উদ্ধৃতাংশের আলোকে উমাচরণ মাস্টারের শিক্ষকসত্তার
মূল্যায়ন করো।
উত্তর: পাঠ্যগল্পে প্রচলিত
পুঁথিগত শিক্ষকতা এবং জীবনের গভীর শিক্ষার মধ্যকার পার্থক্য বোঝাতে এই তাৎপর্যপূর্ণ
উক্তিটি করা হয়েছে:
ক. প্রচলিত পাঠশালার শিক্ষক: বাহ্যিকভাবে উমাচরণ মাস্টার ছিলেন বেতহাতে শৃঙ্খলা বজায়
রাখা এবং পাঠ্যবই মুখস্থ করানো এক সাধারণ গ্রাম্য পণ্ডিত।
খ. পরীক্ষার কৃত্রিমতাকে অতিক্রম: রানাঘাটের উচ্চ প্রাইমারি পরীক্ষার ভীতি যেখানে ছাত্রদের
গ্রাস করছিল, সেখানে মাস্টারমশাই স্বয়ং প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে খাতা-কলম নিয়ে
কবিতা লিখতে বসে যান। পরীক্ষার মতো কৃত্রিম প্রতিযোগিতার চেয়ে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য
যে অনেক বড়ো, তাঁর এই আচরণে তা প্রতিফলিত হয়।
গ. সৌন্দর্যের দৃষ্টিদান: মাস্টারমশাই যখন মাঠের ‘চমৎকার সিনারি’র প্রশংসা করেন, তখন
লেখকের মনের সুপ্ত ভালো লাগা এক পূর্ণতা পায়। ছাত্রের হৃদয়পটে প্রকৃতিকে ভালোবাসার
চোখ তৈরি করে দিয়ে তিনি শ্রেণিকক্ষের সীমানা পেরিয়ে এক চিরন্তন শিক্ষকের মহৎ ভূমিকা
পালন করেছিলেন।
৫. ‘আক্কেল গুড়ুম’ বইটিকে কেন্দ্র
করে উমাচরণ মাস্টার, লেখক এবং পিসিমার যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে, তা বর্ণনা
করো।
উত্তর: উমাচরণ মাস্টারের
লেখা ‘আক্কেল গুড়ুম’ প্রহসনটি গল্পে কেবল একটি বই নয়, বরং তৎকালীন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির
মানসিকতার সংঘাতের প্রতীক:
ক. উমাচরণ মাস্টারের অহমিকা: মাস্টারমশাই নিজের সাহিত্যিক প্রতিভার নিদর্শন হিসেবে
এই বইটিকে দেখতেন। ছাত্রদের মাইনের টাকা কেটে এই বই গছিয়ে দিয়ে তিনি তাঁর অপূর্ণ লেখকসত্তার
তৃপ্তি খুঁজতেন।
খ. বালকের সরল মুগ্ধতা: লেখক শৈশবে প্রহসন শব্দের অর্থ না বুঝলেও শিক্ষকের লেখা বইটিকে
এক অলৌকিক শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন এবং গর্বের সঙ্গে তা রক্ষা করতে চেয়েছিলেন।
গ. পিসিমার বাস্তববাদী ও ধর্মপ্রাণ দৃষ্টিভঙ্গি: পিসিমার কাছে এই অবাস্তব বইটি ছিল
অপচয়। তিনি ন আনা পয়সার ক্ষতিতে ক্রুদ্ধ হয়ে ‘কেষ্টর শতনাম’-এর মতো পারমার্থিক বই চেয়েছিলেন।
গ্রামীণ মধ্যবিত্তের আর্থিক অভাব এবং ধর্মীয় মানসিকতার সঙ্গে মাস্টারের কাগুজে পাণ্ডিত্যের
বিরোধ এখানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
৬. চালতেবাগানের দৃশ্যপটে উমাচরণ মাস্টারের
সাহিত্যসাধনা ও দুই বালকের প্রতিক্রিয়া আলোচনা করো।
উত্তর: চালতেবাগানের নির্জন
দৃশ্যপটটি গল্পের অন্যতম সুন্দর ও কাব্যময় মুহূর্ত:
ক. নিভৃত পরিবেশ: বহুকালের প্রাচীন আম ও তেঁতুলের গভীর ছায়ায় দিনদুপুরেও সন্ধ্যার অন্ধকার
নেমে আসত। এমন নিবিড় পরিবেশে মাস্টারমশাই ছেঁড়া মাদুর পেতে কাগজের ওপর মাটির ঢেলা চাপা
দিয়ে বসতেন।
খ. মাস্টারের সাধনার রূপ: উপুড় হয়ে লেখা, আনমনা হয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকা এবং আপনমনে
ফিক ফিক করে হাসার মতো দৃশ্যগুলি ছিল এক নির্ভেজাল সৃষ্টির রূপ, যা বাইরে থেকে দেখলে
পাগলামি মনে হতে পারে।
গ. দুই বালকের মুগ্ধতা: সতু ও লেখক শ্যাওড়া ঝোপের আড়াল থেকে এই দৃশ্য দেখে অভিভূত হয়েছিল।
কতবেল খাওয়ার লোভ ত্যাগ করে তারা একজন ‘জীবন্ত কবি’র কার্যকলাপ প্রত্যক্ষ করেছিল। সতু
সসম্ভ্রমে জানিয়েছিল যে বড়ো কবিরা এভাবেই লেখেন, যা লেখকের মনে মাস্টারের প্রতি অগাধ
শ্রদ্ধা তৈরি করেছিল।
৭. রানাঘাটের উচ্চ প্রাইমারি পরীক্ষা
সম্পর্কে বালকদের মনে যে ভীতি তৈরি হয়েছিল, তার বিবরণ দাও।
উত্তর: তৎকালীন গ্রামীণ
পাঠশালার ছাত্রদের কাছে মহকুমা শহরের পরীক্ষা ব্যবস্থা ছিল এক জীবন্ত আতঙ্ক:
ক. ইন্সপেক্টরের ভয় দেখানো: স্কুলের ইন্সপেক্টর আগে থেকেই ছেলেদের ভয় পাইয়েছিলেন যে
রানাঘাটে পরীক্ষার হলে কড়া গার্ড থাকবে এবং ঘাড়ের ওপর ঝুঁকে নজরদারি করবে।
খ. আইনের নির্মম ভয়: এতটুকু ফিসফাস বা দেখাদেখি করলেই মহকুমা হাকিমের এজলাসে টেনে নিয়ে
যাওয়া হবে এবং তিনি জরিমানা বা জেল দিতে পারেন— এমন আজগুবি ও কঠোর শাস্তির ভয় তাদের
গ্রাস করেছিল।
গ. মানসিক অবস্থা: ‘নবমীর পাঁঠার মতো কাঁপতে কাঁপতে’ পরীক্ষা হলে ঢোকার কথা ভেবে তাদের
শৈশব আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিল। শহরের যান্ত্রিক ও বিচারভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা পাড়াগাঁয়ের
শিশুদের ওপর যে মানসিক পীড়ন চাপিয়ে দিত, লেখক তার বাস্তব রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন।
৮. “যশোভাগ্য সকলের কি থাকে!” — গল্পের
শেষাংশের এই দার্শনিক উপলব্ধির তাৎপর্য আলোচনা করো।
উত্তর: গল্পের সমাপ্তিতে
লেখকের এই খেদোক্তি সমগ্র মানবজীবনের এক চিরন্তন সত্যকে স্পর্শ করেছে:
ক. অপূর্ণতার সত্য: উমাচরণ চক্রবর্তী সারা জীবন কাব্য ও নাটকের সাধনা করে গেলেও বাংলা
সাহিত্যে কোনো স্বীকৃতি পাননি। বৃহত্তর জনসমাজ তাঁর নাম জানতেও পারেনি।
খ. স্বীকৃতির চেয়ে সাধনার মূল্য: লেখক বুঝেছিলেন জাগতিক খ্যাতি বা পুরস্কারই একজন স্রষ্টার
একমাত্র মাপকাঠি নয়। বহু মানুষ নীরবে শিল্পকে ভালোবেসে নিঃস্বার্থভাবে বাঁচেন। উমাচরণ
মাস্টারের অন্তরে যে খাঁটি সৃষ্টির আনন্দ ছিল, তা যশোভাগ্যের চেয়ে কম মূল্যবান ছিল
না।
গ. স্মৃতির অমরত্ব: লেখক যখন পঁচিশ-ত্রিশ বছর পর ধ্বংসপ্রাপ্ত শাবলতলার মাঠে দাঁড়িয়ে
মাস্টারের কথা ভেবে ব্যথিত হন, তখন মাস্টারমশাই কোনো মুদ্রিত বইয়ের পাতায় নয়, বরং তাঁর
একনিষ্ঠ শিষ্যের অন্তরে চিরকালের মতো অমর হয়ে থাকেন।
৯. ‘শাবলতলার মাঠ’ গল্পে প্রতিফলিত
গ্রামীণ নিসর্গ ও উদ্ভিদ-জীববৈচিত্র্যের পরিচয় দাও।
উত্তর: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের
রচনায় প্রকৃতির উদ্ভিদ ও জীবের সূক্ষ্ম রূপ চিরকাল প্রাধান্য পেয়েছে, ‘শাবলতলার মাঠ’
গল্পটিও তার ব্যতিক্রম নয়:
ক. উদ্ভিদের প্রাচুর্য: গল্পে চালতেবাগানের প্রাচীন আম ও তেঁতুল গাছ এবং তাদের জড়িয়ে
থাকা মোটা লতাপাতার বর্ণনা রয়েছে। শাবলতলার মাঠে দেখা যায় কুলগাছ, শ্যাওড়া-ডাঁটা, বনতুলসীর
অরণ্য এবং বুনো কলুচটকা ও তিত্তিরাজ গাছ। তিত্তিরাজ গাছে লাল কেলেকোঁড়া ফুলের লতা জড়িয়ে
থাকার চিত্রটি এক অপূর্ব বুনো রূপ তৈরি করে।
খ. জীববৈচিত্র্য: নির্জন প্রান্তরের বেলে জমিতে খেঁকশেয়ালের গর্ত এবং ঝোপে ঝোপে শালিক
ও ছাতারে পাখির অবিরাম কলরব মাঠটিকে জীবন্ত করে তোলে। গন্ধ, বর্ণ ও শব্দের সমন্বয়ে
লেখক এক সজীব গ্রামীণ বাস্তুতন্ত্রের চিত্র এঁকেছেন।
১০. ‘শাবলতলার মাঠ’ গল্পে সারদা ও
সতু চরিত্র দুটির তুলনামূলক আলোচনা করো।
উত্তর: চারটি বালকের মধ্যে
সতু এবং সারদা চরিত্র দুটি পরস্পরের সম্পূর্ণ বিপরীত স্বভাবের প্রতিনিধি হিসেবে চিত্রিত
হয়েছে:
ক. ভাবুক ও ভক্ত সতু: সতু ছিল রোমান্টিক ও ভাবপ্রবণ। সে মাস্টারমশাইকে মন থেকে বড়ো
পণ্ডিত ও কবি বলে মানত। চালতেবাগানে মাস্টারের বিড়বিড় করাকে সে কবির লক্ষণ বলে শ্রদ্ধার
চোখে দেখেছিল এবং মাঠে মাস্টারকে খুঁজতে গিয়ে বাঘের ভয়ে বিহ্বল হয়ে পড়েছিল।
খ. বাস্তববাদী ও সাহসী সারদা: সারদা ছিল যুক্তিপ্রিয় ও বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন। মাস্টারমশাই
যখন বলেন বড়ো লেখকরা প্রথম জীবনে মাস্টারি করেন, তখন সে মাস্টারের বয়স নিয়ে প্রশ্ন
তুলে খটকা ধরিয়ে দিয়েছিল। আবার মাঠে যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, তখন কবির সাধনায় ব্যাঘাত
ঘটার পরোয়া না করে সজোরে কেশে মাস্টারের ধ্যান ভাঙিয়ে সে বাস্তব বুদ্ধিমত্তার পরিচয়
দেয়।
১১. শাবলতলার মাঠে হারিয়ে যাওয়া মাস্টারমশাইকে
খোঁজার রোমাঞ্চকর ঘটনাটি বর্ণনা করো।
উত্তর: গাছতলায় বসে আড্ডা
ও খেলার মাঝে হঠাৎ সতু লক্ষ্য করে মাস্টারমশাই কোথাও নেই:
ক. উদ্বেগ ও আশঙ্কা: দু ঘণ্টার বেশি সময় কেটে গেছে, ট্রেন ধরতে হবে অথচ নির্জন মাঠে
মাস্টার নেই। সতু ভয় পেয়ে ভেবেছিল বাঘে নিয়ে গেছে, কানাই চিৎকার করে ডাকলেও কোনো সাড়া
মেলেনি। চারিদিকের নিস্তব্ধতা এক রহস্য ও ভয়ের আবহ তৈরি করে।
খ. অনুসন্ধান: কানাই ও সতু এদিক ওদিক খুঁজতে বের হয়। লেখক যদিও খেলায় মগ্ন ছিলেন, কিন্তু
পরিস্থিতি ক্রমেই গম্ভীর হয়ে ওঠে।
গ. সারদার আবিষ্কার ও নাট্যমুহূর্ত: সারদা হাঁপাতে হাঁপাতে এসে সবাইকে চুপচাপ অনুসরণ
করতে বলে। শুকনো খালের নিচে কুঁচঝোপের আড়ালে গিয়ে দেখা যায় মাস্টারমশাই কোনো বিপদে
পড়েননি, বরং উন্মাদ কবির মতো ঝুঁকে পড়ে আপনমনে কবিতা লিখছেন। এই ঘটনাটি উদ্বেগের অবসান
ঘটিয়ে এক মধুর বিস্ময় এনে দেয়।
১২. “আমার কথা এখানেই শেষ। উমাচরণ
মাস্টারের ইতিহাসও এখানেই শেষ।” — লেখকের এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: এই উক্তির মাধ্যমে
লেখক তাঁর শৈশবের এক পরম মধুর অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন:
ক. শৈশবস্মৃতির যবনিকাপাত: শাবলতলার সেই অপরাহ্ণের পর লেখক ও মাস্টারের যৌথ স্মৃতি
আর এগোয়নি। পরীক্ষা শেষ হওয়া এবং কালক্রমে শৈশব পেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে সেই দিনটির
তাৎপর্য চিরকালের জন্য স্মৃতির মণিকোঠায় বন্দি হয়ে যায়।
খ. সাধারণ মানুষের বিস্মৃতি: উমাচরণ মাস্টার কোনো ঐতিহাসিক বা বিখ্যাত পুরুষ ছিলেন
না। তিনি ছিলেন গ্রামীণ সমাজের এক সাধারণ স্বল্পখ্যাত মানুষ। তাই তাঁর ‘ইতিহাস’ কেবল
এই বালকের স্মৃতিরূপেই সীমাবদ্ধ, বৃহত্তর পৃথিবীর রেকর্ডে তাঁর কোনো চিহ্ন নেই। এই
ভাবনার মধ্যে জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বের সুর বেজে উঠেছে।
১৩. গল্পে পিসিমার বাড়ি ও দুর্গাপুর
গ্রামের সামাজিক পরিবেশের কী চিত্র পাওয়া যায়?
উত্তর: ‘শাবলতলার মাঠ’ গল্পে
উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের শুরুর দিকের গ্রামবাংলার সমাজজীবনের এক নিখুঁত চিত্র ফুটে
ওঠে:
ক. শিক্ষা ব্যবস্থা: তখন ইউ. পি. বা উচ্চ প্রাইমারি পাঠশালাই ছিল গ্রামীণ শিক্ষার প্রধান
কেন্দ্র। সেখানে শিক্ষকের বেতন ছিল নামমাত্র এবং ছাত্রের মাইনে থেকে কয়েক আনা ফেরত
পাওয়াও ছিল পরিবারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
খ. গ্রামীণ বাসস্থান ও সংস্কৃতি: রায় জমিদারদের ভাঙা বৈঠকখানা, তক্তপোশ, পেরেকের গায়ে
হুঁকো আর আলনায় আধময়লা কাপড় দিয়ে গ্রামীণ দরিদ্র জীবনের চিত্র স্পষ্ট হয়।
গ. মানুষের সরল মানসিকতা: বিয়ের পাত্র খুঁজতে দূর গ্রামে গোরুর গাড়িতে যাওয়া, ‘কেষ্টর
শতনাম’ পড়ার মতো ধর্মবোধ এবং গিরিশ ঘোষের মতো দূরবর্তী নক্ষত্রের গল্পে মুগ্ধ হওয়ার
মধ্যে এক নিস্তরঙ্গ, সরল গ্রামীণ সমাজের রূপ ধরা পড়ে।
১৪. শাবলতলার মাঠের বুনো গন্ধ ও পাখির
ডাক কীভাবে বালকদের স্মৃতিতে চিরস্থায়ী হয়ে রইল?
উত্তর: লেখক তাঁর বর্ণনায়
ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতির অসাধারণ ব্যবহার করেছেন:
ক. ঘ্রাণ ও স্পর্শ: দুপুরের তীব্র রোদে বনতুলসীর মঞ্জরী থেকে যে মাতাল করা সুগন্ধ বের
হচ্ছিল, তা বালকদের সমস্ত ক্লান্তি দূর করে দিয়েছিল। শুকনো পাতার ওপর দিয়ে মচমচ করে
হেঁটে চলার স্পর্শ তাদের রোমাঞ্চিত করেছিল।
খ. পাখির কলতান: ঝোপে ঝোপে শালিক ও ছাতারে পাখির কলরব নির্জন মাঠকে এক সংগীতময় প্রাণবন্ততা
দান করেছিল।
গ. স্মৃতির অমলিনতা: এই গন্ধ ও শব্দ কোনো শহরের কৃত্রিম পার্কে মেলে না। এটি ছিল আদিম
ও চিরন্তন প্রকৃতির স্পর্শ, যা পঁচিশ বছর পরেও লেখকের মনে রূপকথার সুদূরের ইঙ্গিত হিসেবে
চিরভাস্বর হয়ে রয়ে গিয়েছিল।
১৫. গল্পে উল্লিখিত ‘আক্কেল গুড়ুম’
প্রহসনের বিষয়বস্তু ও প্রাসঙ্গিকতা আলোচনা করো।
উত্তর: উমাচরণ মাস্টারের
লেখা ‘আক্কেল গুড়ুম’ প্রহসনটি তৎকালীন সামাজিক পটভূমির ওপর আলোকপাত করে:
ক. বিষয়বস্তু: বইটির বিস্তারিত জানা না গেলেও লেখক উল্লেখ করেছেন যে এতে এক ‘ইংরেজি-পড়া
ছোকরা’র চরিত্র ছিল, এবং পড়ার ভঙ্গিতে বোঝা যেত সেই ছোকরা চরিত্রটি খুব একটা ভালো লোক
নয়।
খ. সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা: উনিশ শতকে আধুনিক ইংরেজি শিক্ষা ও শহুরে চালচলনের প্রভাবে
গ্রাম্য সংস্কার ও ঐতিহ্যে যে আঘাত লাগছিল, রক্ষণশীল গ্রামীণ সমাজ তাকে সুনজরে দেখত
না। মাস্টারমশাই প্রহসনের মাধ্যমে সেই ইংরেজিয়ানাকে ব্যঙ্গ করেছিলেন।
গ. সাহিত্যিক অপূর্ণতা: বইটি হয়তো উচ্চমানের সাহিত্য ছিল না, কিন্তু একজন গ্রাম্য শিক্ষকের
চারপাশের পরিবর্তনকে নাট্যরূপে ধরার যে অদম্য চেষ্টা, তা এর মাধ্যমে সার্থকভাবে ফুটে
ওঠে।
১৬. ‘শাবলতলার মাঠ’ গল্পে লেখকের আত্মজীবনীর
কোন্ কোন্ উপাদান লক্ষ্য করা যায়?
উত্তর: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের
বহু রচনাতেই তাঁর নিজের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার ছায়া দেখা যায়, এই গল্পটিও তার উজ্জ্বল
দৃষ্টান্ত:
ক. উত্তর চব্বিশ পরগনার পটভূমি: রানাঘাট, মার্টিন রেলওয়ে লাইন এবং সংলগ্ন গ্রামীণ জনপদের
বর্ণনা বিভূতিভূষণের নিজের বেড়ে ওঠার ভৌগোলিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
খ. দারিদ্র্য ও পাঠশালার অভিজ্ঞতা: বাল্যকালে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বড়ো হওয়া এবং দূরবর্তী
স্কুলে হেঁটে যাওয়ার অভিজ্ঞতা লেখকের নিজের জীবনের সত্য।
গ. অরণ্য ও প্রকৃতির প্রতি আজীবন প্রেম: পথের পাঁচালী বা আরণ্যকের মতো এই গল্পেও গাছপালা,
পাখির ডাক ও নির্জন প্রান্তরের প্রতি যে ব্যাকুল ভালোবাসা দেখা যায়, তা স্বয়ং বিভূতিভূষণের
সহজাত কবিমানসেরই বাস্তব প্রকাশ।
১৭. উমাচরণ মাস্টারের সঙ্গে তাঁর ছাত্রদের
সম্পর্কের স্বরূপটি কীরূপ ছিল?
উত্তর: উমাচরণ মাস্টার ও
তাঁর ছাত্রদের সম্পর্কটি ভয়, শাসন, কৌতুক এবং গভীর শ্রদ্ধার এক অদ্ভুত মেলবন্ধন:
ক. শাসনের দিক: মাস্টারের তক্তপোশের নিচে তেলে-জলে পাকানো বেত থাকত এবং সারদার মতো
অবাধ্য ছাত্রকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেওয়ার মতো শিক্ষকসুলভ কঠোরতা তাঁর ছিল।
খ. দূরত্বহীন সরলতা: ছাত্রদের কাছে নিজের বই নিয়ে গর্ব করা, তাদের নিজের প্রহসন পড়ে
শোনানো এবং খুচরো পয়সার বদলে বই গছিয়ে দেওয়ার মধ্যে কোনো কৃত্রিম দূরত্ব ছিল না।
গ. অনুপ্রেরণার সম্পর্ক: শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার ভয় দূর করে প্রকৃতির রূপের প্রতি ছাত্রদের
আকৃষ্ট করার মাধ্যমে তিনি ছাত্রদের কাছে কেবল একজন মাস্টার থাকেননি, এক অবিস্মরণীয়
ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন।
১৮. “সেদিন আবার কার্যোপলক্ষে গোরুর
গাড়ি চড়ে যেতে যেতে শাবলতলার মাঠ চোখে পড়ল...” — এই প্রারম্ভিক পরিস্থিতির গুরুত্ব
কী?
উত্তর: গল্পের সূচনাক্ষণটি
সমগ্র কাহিনির প্রেক্ষাপট তৈরিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ:
ক. স্মৃতির দুয়ার উন্মোচন: দীর্ঘ পঁচিশ-ত্রিশ বছর পর নিছক এক পারিবারিক প্রয়োজনে মেয়ের
বিয়ের পাত্র খুঁজতে যাওয়ার সময় হঠাৎ মাঠটি দেখে লেখকের মনের ভেতর শৈশবের হারানো স্মৃতি
জাগ্রত হয়।
খ. অতীত ও বর্তমানের সংযোগ সেতু: এই আকস্মিক দর্শনের ফলেই বর্তমানের কারখানা-বিধ্বস্ত
রুক্ষ শাবলতলার সাথে অতীতের শান্ত, সবুজ শাবলতলার তুলনামূলক আলোচনা সম্ভব হয়েছে।
গ. বিষাদের সুর স্থাপন: শুরুতে মাঠের এই শিল্পায়ন দেখার ফলে যে হাহাকার তৈরি হয়, তা
গল্পটিকে একটি গভীর নস্টালজিক ও পরিবেশবাদী মাত্রা দান করে।
১৯. ‘শাবলতলার মাঠ’ গল্পটির নামকরণের
সার্থকতা বিচার করো।
উত্তর: সাহিত্যে নামকরণ
কেবল একটি পরিচয় নয়, তা কাহিনির মূল ভাববস্তুর ধারক। ‘শাবলতলার মাঠ’ গল্পের নামকরণের
যৌক্তিকতা নিচে দেওয়া হলো:
ক. ঘটনার পটভূমি: লেখকের শৈশবের পরীক্ষা দিতে যাওয়ার পথে কাটানো অবিস্মরণীয় দুপুর এবং
উমাচরণ মাস্টারের কাব্যসাধনার কেন্দ্রস্থল ছিল এই শাবলতলার মাঠ।
খ. রূপক তাৎপর্য: শাবলতলার মাঠ কেবল মাটির প্রান্তর নয়; এটি বালকদের শৈশবের মুক্তি,
স্বাধীনতা এবং সৌন্দর্যানুভূতির প্রতীক।
গ. পরিবর্তনের ট্র্যাজেডি: গল্পের শুরুতে এবং শেষে এই মাঠটির রূপবদল— প্রকৃতির স্নিগ্ধ
রূপ হারিয়ে কারখানার ইট-কয়লায় পরিণত হওয়া— লেখকের মূল বেদনার কারণ। সমগ্র কাহিনিটি
এই মাঠকে ঘিরেই আবর্তিত ও তাৎপর্যমণ্ডিত হয়েছে, তাই এই নামকরণ সর্বতোভাবে সার্থক।
২০. ‘শাবলতলার মাঠ’ পাঠ্যাংশটি থেকে
আজকের আধুনিক সমাজের কী শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত বলে তুমি মনে করো?
উত্তর: বিভূতিভূষণের এই
গল্পটি সমকালীন আধুনিক যান্ত্রিক সমাজের জন্য এক গভীর শিক্ষণীয় বার্তা বহন করে:
ক. অপরিকল্পিত শিল্পায়নের বিপদ: প্রগতির নামে কলকারখানা তৈরি করতে গিয়ে যেভাবে সবুজ
মাঠ, গাছপালা ও বুনো প্রকৃতিকে ধ্বংস করা হচ্ছে, তাতে পৃথিবী তার স্বাভাবিক স্নিগ্ধতা
ও ভারসাম্য হারাচ্ছে।
খ. শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য: পুঁথিগত মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষার অন্ধ প্রতিযোগিতা শিশুদের
মনের স্বাভাবিক বিকাশ ও আনন্দকে হত্যা করে। প্রকৃতির উদার সান্নিধ্যই পারে মানুষকে
প্রকৃত মানবিক গুণে সমৃদ্ধ করতে।
গ. সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা: নামযশহীন গ্রাম্য শিল্পীদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসাকে মূল্যায়ন
করা এবং যান্ত্রিকতার ভিড়ে মানবজীবনের সরল আনন্দগুলিকে বাঁচিয়ে রাখাই হলো এই গল্পের
সবচেয়ে বড়ো আধুনিক শিক্ষা।