জ্ঞানচক্ষু' || আশাপূর্ণা দেবী || মাধ্যমিক বাংলা চূড়ান্ত প্রস্তুতি ও সাজেশন গাইড

 

মাধ্যমিক বাংলা চূড়ান্ত প্রস্তুতি ও সাজেশন গাইড

অধ্যায়: 'জ্ঞানচক্ষু' — আশাপূর্ণা দেবী 

প্রশ্ন 1: ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পটির রচয়িতা কে? [মান: 1]

উত্তর: আশাপূর্ণা দেবী।

প্রশ্ন 2: কার কথা শুনে তপনের চোখ মার্বেল হয়ে গেল? [মান: 1]

উত্তর: নতুন মেসোমশাই একজন সত্যিকার লেখক এবং তাঁর অনেক বই ছাপা হয়েছে—এ কথা শুনে।

প্রশ্ন 3: ‘চোখ মার্বেল হয়ে যাওয়া’ বাগধারাটির অর্থ কী? [মান: 1]

উত্তর: বিস্ময়ে হতবাক বা চোখ গোল গোল হয়ে যাওয়া।

প্রশ্ন 4: তপনের কোন মাসির বিয়ে হয়েছিল? [মান: 1]

উত্তর: ছোটোমাসির।

প্রশ্ন 5: ছোটোমাসির বিয়ে কেমনভাবে হয়েছিল? [মান: 1]

উত্তর: দেদার ঘটাপটা করে।

প্রশ্ন 6: নতুন মেসোমশাই পেশায় কী ছিলেন? [মান: 1]

উত্তর: কলেজের প্রফেসার (অধ্যাপক)।

প্রশ্ন 7: লেখকদের সম্পর্কে পূর্বে তপনের কী ধারণা ছিল? [মান: 1]

উত্তর: লেখকরা সাধারণ মানুষের মতো নয়, তারা যেন আকাশ থেকে পড়া কোনো বিশেষ জীব।

প্রশ্ন 8: তপনের নতুন মেসোকে দেখে কীভাবে প্রথম জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হয়েছিল? [মান: 1]

উত্তর: নতুন মেসোকে সাধারণ মানুষের মতো দাড়ি কামাতে, খেতে, ঘুমাতে ও তর্ক করতে দেখে তপন বুঝল লেখকরাও রক্তমাংসের সাধারণ মানুষ।

প্রশ্ন 9: খাবার টেবিলে মেসোমশাই কী বলে খাবার অর্ধেক তুলিয়ে দেন? [মান: 1]

উত্তর: 'আরে ব্যস, এত কখনো খাওয়া যায়?'

প্রশ্ন 10: মেসোমশাই কখন স্নান ও ঘুমোন? [মান: 1]

উত্তর: চানের সময় চান করেন এবং ঘুমের সময় ঘুমোন।

প্রশ্ন 11: মেসোমশাই খবরের কাগজ নিয়ে তর্ক শেষে কী মন্তব্য করেন? [মান: 1]

উত্তর: 'এ দেশের কিছু হবে না' বলে মন্তব্য করেন।

প্রশ্ন 12: তর্ক করার পর মেসোমশাই কোথায় যেতেন? [মান: 1]

উত্তর: সিনেমা দেখতে চলে যেতেন বা সেজেগুজে বেড়াতে বেরোতেন।

প্রশ্ন 13: তপন কোথায় কেন এসেছিল? [মান: 1]

উত্তর: মামার বাড়িতে ছোটোমাসির বিয়ে উপলক্ষে এসেছিল।

প্রশ্ন 14: ছুটি থাকায় বিয়ে মিটে গেলেও তপন মামার বাড়িতে কী করেছিল? [মান: 1]

উত্তর: মামার বাড়িতে থেকে গিয়েছিল।

প্রশ্ন 15: মেসোমশাই কেন শ্বশুরবাড়িতে এসে কিছুদিন রয়ে গিয়েছিলেন? [মান: 1]

উত্তর: কারণ তাঁর কলেজে তখন গরমের ছুটি চলছিল।

প্রশ্ন 16: মেসোকে দেখে তপনের মনে কোন প্রত্যয় জেগেছিল? [মান: 1]

উত্তর: তপনদের মতোই সাধারণ মানুষ যদি লেখক হতে পারে, তবে তপনের লেখক হতে বাধা কী?

প্রশ্ন 17: মেসোমশাই যখন দিবানিদ্রা দিচ্ছিলেন, তখন কে তাঁর দিকে ধাবিত হয়েছিল? [মান: 1]

উত্তর: তপনের ছোটোমাসি।

প্রশ্ন 18: ছোটোমাসি মেসোর দিকে ধাবিত হয়েছিল কেন? [মান: 1]

উত্তর: তপনের লেখা প্রথম গল্পটি মেসোকে দেখাতে।

প্রশ্ন 19: ছোটোমাসির যাওয়া দেখে তপন কী আপত্তি জানিয়েছিল? [মান: 1]

উত্তর: তপন 'না আ-আ-' করে প্রবল আপত্তি তুলেছিল।

প্রশ্ন 20: মুখে আপত্তি জানালেও তপন মনে মনে কেমন অনুভব করেছিল? [মান: 1]

উত্তর: মনে মনে অত্যন্ত পুলকিত হয়েছিল।

প্রশ্ন 21: তপন কেন মনে করেছিল মেসোই তাঁর লেখার মূল্য বুঝবেন? [মান: 1]

উত্তর: কারণ রত্নের মূল্য যেমন জহুরির কাছে, তেমনি লেখার প্রকৃত মূল্য একজন লেখক মেসোই বুঝবেন।

প্রশ্ন 22: গল্পটি দেখে মেসোমশাই কী মন্তব্য করেছিলেন? [মান: 1]

উত্তর: 'তপন, তোমার গল্প তো দিব্যি হয়েছে। একটু কারেকশান করে দিলে ছাপতে দেওয়া চলে।'

প্রশ্ন 23: মেসোমশাইয়ের প্রশংসাকে তপন প্রথমে কী মনে করেছিল? [মান: 1]

উত্তর: ঠাট্টা মনে করেছিল।

প্রশ্ন 24: মেসোমশাইয়ের মুখে কী দেখে তপন আহ্লাদে কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল? [মান: 1]

উত্তর: মেসোর মুখে আন্তরিক করুণার ছাপ দেখে।

প্রশ্ন 25: মেসো কোন পত্রিকায় তপনের গল্প ছাপিয়ে দেওয়ার কথা বলেন? [মান: 1]

উত্তর: 'সন্ধ্যাতারা' পত্রিকায়।

প্রশ্ন 26: ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকার সম্পাদক কেন মেসোর কথা ফেলবেন না? [মান: 1]

উত্তর: কারণ মেসোমশাই তাঁর পরিচিত এবং শ্রদ্ধেয় লেখক ও অধ্যাপক ছিলেন।

প্রশ্ন 27: বিকেলে চায়ের টেবিলে তপনের গল্প শুনে বাড়ির অন্যান্যদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? [মান: 1]

উত্তর: সবাই শুনে হাসাহাসি করেছিল।

প্রশ্ন 28: মেসোমশাইয়ের মতে সাধারণত এই বয়সের ছেলেমেয়েরা কী ধরনের গল্প লেখে? [মান: 1]

উত্তর: রাজারানির গল্প, খুন-জখম-অ্যাকসিডেন্ট অথবা অনাহারে না খেতে পেয়ে মরে যাওয়ার গল্প।

প্রশ্ন 29: তপন তার গল্পের বিষয়বস্তু হিসেবে কী নির্বাচন করেছিল? [মান: 1]

উত্তর: স্কুলে ভরতি হওয়ার দিনের নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি।

প্রশ্ন 30: তপনের গল্পের বিষয়বস্তু দেখে মেসো কী মন্তব্য করেছিলেন? [মান: 1]

উত্তর: মেসো বলেছিলেন তপনের হাত এবং চোখ দুটোই আছে, অর্থাৎ লেখার পর্যবেক্ষণ ও প্রকাশক্ষমতা আছে।

প্রশ্ন 31: মেসো যখন ছুটি ফুরিয়ে গল্পটি নিয়ে চলে যান, তখন তপন কী করছিল? [মান: 1]

উত্তর: তপন গভীর কৃতজ্ঞতায় কৃতার্থ হয়ে বসে বসে দিন গুনছিল।

প্রশ্ন 32: ছেলেবেলা থেকেই তপন গল্পের বিষয়ে কী অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিল? [মান: 1]

উত্তর: রাশি রাশি গল্প শুনেছিল এবং বস্তা বস্তা গল্প পড়েছিল।

প্রশ্ন 33: তপন কোথায় বসে প্রথম গল্পটি লিখেছিল? [মান: 1]

উত্তর: মামার বাড়ির তিনতলার সিঁড়িতে নির্জন দুপুরে একাসনে বসে।

প্রশ্ন 34: গল্প লেখার জন্য তপন কোন খাতাটি ব্যবহার করেছিল? [মান: 1]

উত্তর: স্কুলের হোম টাস্কের খাতা।

প্রশ্ন 35: হোম টাস্কের খাতাটি মামার বাড়িতে কে আনিয়েছিলেন? [মান: 1]

উত্তর: তপনের মা জোর করে আনিয়ে ছেড়েছিলেন।

প্রশ্ন 36: গল্পটি সম্পূর্ণ লেখার পর পড়ার সময় তপনের শারীরিক অনুভূতি কেমন হয়েছিল? [মান: 1]

উত্তর: গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল এবং মাথার চুল খাড়া হয়ে উঠেছিল।

প্রশ্ন 37: গল্পটি লেখার পর তপন নিজের পরিচয় সম্পর্কে কী ভেবেছিল? [মান: 1]

উত্তর: তপন ভেবেছিল তাকে এখন সত্যি সত্যি 'লেখক' বলা চলে।

প্রশ্ন 38: গল্প লেখা শেষ করে তপন তীব্র উত্তেজনায় কার কাছে ছুটে গিয়েছিল? [মান: 1]

উত্তর: ছোটোমাসির কাছে।

প্রশ্ন 39: ছোটোমাসি বয়সে তপনের চেয়ে কত বছরের বড়ো ছিল? [মান: 1]

উত্তর: বছর আষ্টেকের (আট বছরের) বড়ো।

প্রশ্ন 40: বয়সে বড়ো হলেও ছোটোমাসির সঙ্গে তপনের সম্পর্ক কেমন ছিল? [মান: 1]

উত্তর: সমবয়সি বন্ধুর মতো আন্তরিক সম্পর্ক।

প্রশ্ন 41: বিয়ে হওয়ার পর ছোটোমাসির আচরণে কী পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিল তপন? [মান: 1]

উত্তর: ছোটোমাসি যেন কিছুটা মুরুব্বি মুরুব্বি স্বভাবের হয়ে গেছে।

প্রশ্ন 42: গল্পটি দেখে ছোটোমাসি তপনকে পিঠ চাপড়ে কী প্রশ্ন করেছিল? [মান: 1]

উত্তর: 'ওমা এ তো বেশ লিখেছিস রে? কোনোখান থেকে টুকলিফাই করিসনি তো?'

প্রশ্ন 43: ছোটোমাসির 'টুকলিফাই' করার সন্দেহে তপন কী প্রতিক্রিয়া দিয়েছিল? [মান: 1]

উত্তর: তপন ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিল, 'আঃ ছোটোমাসি, ভালো হবে না বলছি।'

প্রশ্ন 44: মামার বাড়ি থেকে বাড়ি ফিরে এসেও তপন কীসের অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসেছিল? [মান: 1]

উত্তর: গল্পের সেই আঁটসাঁট ছাপার অক্ষরে গাঁথা রূপটি দেখার জন্য।

প্রশ্ন 45: বাড়িতে তপনকে নিয়ে সবাই কী নামে ঠাট্টা-তামাশা করত? [মান: 1]

উত্তর: 'কবি', 'সাহিত্যিক', 'কথাশিল্পী'।

প্রশ্ন 46: পরিবারের সদস্যদের ব্যঙ্গোক্তি সত্ত্বেও তপন কী করেছিল? [মান: 1]

উত্তর: ঠাট্টা-তামাশার মধ্যেই আরও দু-তিনটি নতুন গল্প লিখে ফেলেছিল।

প্রশ্ন 47: গল্প লেখার মোহে পড়ে তপনের কোন কাজের ক্ষতি হচ্ছিল? [মান: 1]

উত্তর: স্কুলের হোম টাস্ক করা হয়ে উঠছিল না।

প্রশ্ন 48: ছুটি ফুরিয়ে যাওয়ার পর প্রথম গল্পটি সম্পর্কে তপনের মানসিক অবস্থা কেমন হয়েছিল? [মান: 1]

উত্তর: একেবারে আশাহীন ও বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিল।

প্রশ্ন 49: কোন দৃশ্য দেখে হঠাৎ তপনের বুকের রক্ত ছলকে উঠেছিল? [মান: 1]

উত্তর: ছোটোমাসি ও নতুন মেসোকে হাতে 'সন্ধ্যাতারা' পত্রিকা নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করতে দেখে।

প্রশ্ন 50: তপনের জীবনের সবচেয়ে সুখের দিন কোনটি হতে পারত? [মান: 1]

উত্তর: যেদিন ছাপার অক্ষরে তার নিজের লেখা হাজার হাজার পাঠকের হাতে পৌঁছাত।

প্রশ্ন 51: পত্রিকার সূচিপত্রে তপনের গল্পের কী নাম ছাপা হয়েছিল? [মান: 1]

উত্তর: 'প্রথম দিন'।

প্রশ্ন 52: সূচিপত্রে লেখকের নাম কীভাবে লেখা হয়েছিল? [মান: 1]

উত্তর: শ্রীতপন কুমার রায়।

প্রশ্ন 53: পত্রিকায় গল্প ছাপা দেখে সারা বাড়িতে কী ঘটেছিল? [মান: 1]

উত্তর: তীব্র আলোড়ন ও শোরগোল পড়ে গিয়েছিল।

প্রশ্ন 54: গল্পটি দেখে আত্মীয়স্বজনের সার্বিক মন্তব্য কী ছিল? [মান: 1]

উত্তর: 'বারে, চমৎকার লিখেছে তো।'

প্রশ্ন 55: তপনের প্রশংসা শুনে মেসোমশাই মৃদু হেসে কী কৈফিয়ত দেন? [মান: 1]

উত্তর: একটু-আধটু 'কারেকশান' করতে হয়েছে, কারণ লেখাটা নেহাতই কাঁচা ছিল।

প্রশ্ন 56: মেসোর কারেকশানের কথা শুনে মাসি কী বলেছিল? [মান: 1]

উত্তর: 'তা হোক, নতুন নতুন অমন হয়-'।

প্রশ্ন 57: তপনের বাবা কারেকশানের খবর পেয়ে কী মন্তব্য করেছিলেন? [মান: 1]

উত্তর: মেসো শুধরে না দিলে তপনের পক্ষে ফট করে কিছু লিখে ছাপিয়ে ফেলা সম্ভব ছিল না।

প্রশ্ন 58: মেজোকাকু লেখক মেসো থাকা নিয়ে কী মন্তব্য করেছিলেন? [মান: 1]

উত্তর: এরকম একজন লেখক মেসো থাকলে তাঁরাও গল্প লেখার চেষ্টা করে দেখতেন।

প্রশ্ন 59: তপনের বাড়িতে বসে ছোটোমাসি কী খাচ্ছিল? [মান: 1]

উত্তর: ডিম ভাজা আর চা।

প্রশ্ন 60: ছোটোমাসির বিপরীতে মেসোমশাই কী পান করছিলেন? [মান: 1]

উত্তর: শুধু কফি।

প্রশ্ন 61: বাড়ির উৎসবে তপন কেন হারিয়ে যাচ্ছিল? [মান: 1]

উত্তর: সবাই মেসোর মহত্ত্ব ও করুণার কথাই আলোচনা করছিল, তপনের মেধার কোনো দাম ছিল না।

প্রশ্ন 62: মেসো নিজে না গেলে সম্পাদক গল্পটি ছোঁবেন না কেন বলা হয়েছিল? [মান: 1]

উত্তর: কারণ মেসোর সুপারিশ ছাড়া কাঁচা লেখকের লেখা কোনো বড় পত্রিকায় ছাপা অসম্ভব বলে ভাবা হতো।

প্রশ্ন 63: গল্প ছাপা হওয়া সত্ত্বেও তপন কেন আনন্দ খুঁজে পাচ্ছিল না? [মান: 1]

উত্তর: আত্মমর্যাদাহানি ও মেসোর করুণার অহংকারে চাপা পড়ে তার আন্তরিক সৃষ্টিসুখ নষ্ট হয়েছিল।

প্রশ্ন 64: মা তপনকে ডেকে কী আদেশ দিয়েছিলেন? [মান: 1]

উত্তর: নিজের মুখে গল্পটি পড়ে সবাইকে শোনাতে বলেছিলেন।

প্রশ্ন 65: মা তপনের বুদ্ধি দেখে কী বলে সম্বোধন করেছিলেন? [মান: 1]

উত্তর: 'বাবা, তোর পেটে পেটে এত!'

প্রশ্ন 66: তপন পড়ার জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিল? [মান: 1]

উত্তর: লজ্জা ভেঙে গলা কেশে পরিষ্কার করে পড়তে শুরু করেছিল।

প্রশ্ন 67: গল্পটি পড়তে গিয়ে তপন কেন স্তম্ভিত হয়ে গেল? [মান: 1]

উত্তর: কারণ গল্পের প্রতিটি লাইন সম্পূর্ণ নতুন, আনকোরা এবং তপনের নিজের লেখার সঙ্গে কোনো মিল ছিল না।

প্রশ্ন 68: মেসো আসলে গল্পটির কী পরিণতি ঘটিয়েছিলেন? [মান: 1]

উত্তর: নিজের পাকা হাতের কলমে তপনের গল্পটিকে আগাগোড়াই নতুন করে লিখে ফেলেছিলেন।

প্রশ্ন 69: গল্প পড়তে না পেরে বোবা হয়ে বসে থাকায় তপনকে কী ধমক শুনতে হয়? [মান: 1]

উত্তর: তার অহংকারে 'পায়া ভারী' হয়ে গেছে এবং অতি আহ্লাদে বাক্য হারিয়ে গেছে।

প্রশ্ন 70: ধমক খেয়ে তপন কী করেছিল? [মান: 1]

উত্তর: মাথায় কিছু না ঢুকলেও যান্ত্রিকভাবে গড়গড়িয়ে অপরিচিত লেখাটি পড়ে গিয়েছিল।

প্রশ্ন 71: পড়া শেষ হওয়ার পর বাড়িতে কার নামে ধন্যি ধন্যি পড়ে গিয়েছিল? [মান: 1]

উত্তর: মেসোমশাইয়ের নামে, কারণ তিনি দয়া করে গল্পটি ছাপিয়ে দিয়েছেন।

প্রশ্ন 72: অসহ্য লজ্জায় তপন বই ফেলে কোথায় চলে গিয়েছিল? [মান: 1]

উত্তর: বাড়ির নির্জন ছাদে।

প্রশ্ন 73: ছাদে গিয়ে তপন কীভাবে নিজের চোখের জল মুছেছিল? [মান: 1]

উত্তর: শার্টের তলাটা তুলে চোখ মুছেছিল।

প্রশ্ন 74: জীবনের সবচেয়ে সুখের দিনটি শেষ পর্যন্ত তপনের জীবনে কী হয়ে দাঁড়াল? [মান: 1]

উত্তর: সবচেয়ে চরম দুঃখের ও বেদনার দিন।

প্রশ্ন 75: ছাদে দাঁড়িয়ে তপন কী দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছিল? [মান: 1]

উত্তর: ভবিষ্যতে কখনও লেখা ছাপতে দিলে সে নিজে গিয়ে দেবে, অন্য কারও দয়ায় নয়।

প্রশ্ন 76: তপন তার লেখার বিষয়ে কেমন দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছিল? [মান: 1]

উত্তর: নিজের কাঁচা লেখা ছাপা হলে হোক, না হলে না হোক।

প্রশ্ন 77: তপন আর কখনও কার বিষয়ে কী শুনতে চায়নি? [মান: 1]

উত্তর: 'অমুক তপনের লেখা ছাপিয়ে দিয়েছে'—এই পরনির্ভরশীল প্রশংসাবাক্য।

প্রশ্ন 78: তপনের কাছে চরমতম দুঃখ ও অপমানের বিষয় কী ছিল? [মান: 1]

উত্তর: নিজের গল্প পড়তে বসে অন্যের লেখা লাইন পাঠ করার গ্লানি।

প্রশ্ন 79: গল্পে তপনের প্রকৃত 'জ্ঞানচক্ষু' কখন উন্মোচিত হয়েছিল? [মান: 1]

উত্তর: আত্মমর্যাদার চরম আঘাত পেয়ে যখন সে পরনির্ভরশীলতার মোহ কাটিয়ে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার শিক্ষা পেল।

প্রশ্ন 80: ‘জ্ঞানচক্ষু’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ কী? [মান: 1]

উত্তর: জ্ঞানের চোখ বা অন্তর্নিহিত চেতনা ও আত্মোপলব্ধি।

প্রশ্ন 81: ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পটি আশাপূর্ণা দেবীর কোন সংকলন থেকে গৃহীত? [মান: 1]

উত্তর: কুমিদুম ও অন্যান্য গল্প (বা লেখিকার বিখ্যাত কিশোর গল্প সংকলন)।

প্রশ্ন 82: আশাপূর্ণা দেবী কত সালে জন্মগ্রহণ করেন? [মান: 1]

উত্তর: ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে।

প্রশ্ন 83: আশাপূর্ণা দেবী কত সালে পরলোকগমন করেন? [মান: 1]

উত্তর: ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে।

প্রশ্ন 84: আশাপূর্ণা দেবীর জন্মস্থান কোথায়? [মান: 1]

উত্তর: কলকাতায়।

প্রশ্ন 85: লেখিকা আশাপূর্ণা দেবীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কেমন ছিল? [মান: 1]

উত্তর: স্কুল-কলেজে পড়ার কোনো আনুষ্ঠানিক সুযোগ তাঁর ঘটেনি।

প্রশ্ন 86: আশাপূর্ণা দেবীর সাহিত্যচর্চার মূল ভিত্তি কী ছিল? [মান: 1]

উত্তর: অসামান্য সূক্ষ্ম দৃষ্টি, তীব্র সংবেদনশীলতা ও বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা।

প্রশ্ন 87: ছোটোদের জন্য লেখা আশাপূর্ণা দেবীর একটি বিখ্যাত বইয়ের নাম লেখো। [মান: 1]

উত্তর: 'ছোট ঠাকুরদার কাশীযাত্রা'।

প্রশ্ন 88: আশাপূর্ণা দেবীর প্রখ্যাত ত্রয়ী উপন্যাসের প্রথম দুটির নাম কী? [মান: 1]

উত্তর: 'প্রথম প্রতিশ্রুতি' ও 'সুবর্ণলতা'।

প্রশ্ন 89: আশাপূর্ণা দেবীর বিখ্যাত ত্রয়ী উপন্যাসের তৃতীয় খণ্ডটির নাম কী? [মান: 1]

উত্তর: 'বকুলকথা'।

প্রশ্ন 90: আশাপূর্ণা দেবীর উপন্যাস 'অগ্নিপরীক্ষা' ছাড়া আর দুটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের নাম লেখো। [মান: 1]

উত্তর: 'সাগর শুকায়ে যায়' এবং 'শশীবাবুর সংসার'।

প্রশ্ন 91: আশাপূর্ণা দেবীর লেখা কতগুলি গ্রন্থ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে? [মান: 1]

উত্তর: অন্তত ৬৩টি গ্রন্থ।

প্রশ্ন 92: আশাপূর্ণা দেবী ভারত সরকারের কোন সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন? [মান: 1]

উত্তর: জ্ঞানপীঠ পুরস্কার।

প্রশ্ন 93: পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রদত্ত কোন সাহিত্য পুরস্কার আশাপূর্ণা দেবী লাভ করেছিলেন? [মান: 1]

উত্তর: রবীন্দ্র পুরস্কার।

প্রশ্ন 94: আশাপূর্ণা দেবী ভারতের জাতীয় স্তরের কোন সাহিত্য অ্যাকাডেমির পুরস্কার লাভ করেন? [মান: 1]

উত্তর: সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার।

প্রশ্ন 95: বিশ্ববিদ্যালয়গুলি লেখিকাকে কোন সাম্মানিক উপাধিতে ভূষিত করেছিল? [মান: 1]

উত্তর: 'ডি. লিট' উপাধিতে।

প্রশ্ন 96: ‘রত্নের মূল্য জহুরির কাছেই’—এখানে 'জহুরি' বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? [মান: 1]

উত্তর: লেখক মেসোমশাইকে।

প্রশ্ন 97: ‘রত্নের মূল্য জহুরির কাছেই’—এখানে 'রত্ন' বলতে কী বোঝানো হয়েছে? [মান: 1]

উত্তর: তপনের লেখা প্রথম মৌলিক ছোটোগল্পটিকে।

প্রশ্ন 98: তপনের গল্পটির মূল বিষয় কী ছিল? [মান: 1]

উত্তর: তার স্কুলে নতুন ক্লাসে ভরতি হওয়ার দিনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।

প্রশ্ন 99: ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে তপন চরিত্রটি কোন বয়সের প্রতিনিধিত্ব করে? [মান: 1]

উত্তর: কৈশোর বা সদ্য বিদ্যালয়ে পাঠরত একজন সংবেদনশীল কিশোরের।

প্রশ্ন 100: ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পের মূল শিক্ষা বা চিরন্তন বার্তাটি কী? [মান: 1]

উত্তর: পরের অনুগ্রহে নয়, স্বাবলম্বন, স্বকীয় মৌলিকতা এবং আত্মমর্যাদাবোধই একজন প্রকৃত স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ অলংকার।

বিভাগ খ: সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৩) — মোট ৫০টি

প্রশ্ন 1: ‘কথাটা শুনে তপনের চোখ মার্বেল হয়ে গেল!’—কোন কথা শুনে কেন তপনের চোখ মার্বেল হয়েছিল? [মান: 3]

উত্তর: তপনের সদ্য বিবাহিত ছোটোমেসো একজন জীবন্ত লেখক এবং তাঁর লেখা প্রচুর বই ছাপা হয়েছে—এই তথ্য শুনে তপন চরম বিস্মিত হয়েছিল। কারণ এর আগে তপন ভাবত লেখকেরা সাধারণ রক্তমাংসের মানুষ নন, আকাশ থেকে পড়া কোনো অলৌকিক জীব। একজন সাধারণ মেসোই যে আস্ত একজন লেখক হতে পারেন, তা তার কল্পনাতীত ছিল।

প্রশ্ন 2: ‘কিন্তু নতুন মেসোকে দেখে জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল তপনের।’—নতুন মেসোকে দেখে তপনের কী ধারণা হয়েছিল? [মান: 3]

উত্তর: নতুন মেসোকে দেখে তপনের শৈশবের ভ্রান্ত ধারণা দূর হয়। সে প্রত্যক্ষ করে মেসোমশাই তপনের বাবা, মামা বা মেজোকাকুর মতোই প্রতিদিন দাড়ি কামান, সিগারেট খান, খাবারের অর্ধেক পাতে ফেলে দেন, স্নান-ঘুম সারেন এবং খবরের কাগজ নিয়ে দেশ সম্পর্কে রাজনৈতিক তর্ক করেন। অর্থাৎ লেখকেরা অন্য কোনো জগতের নয়, নিতান্তই সাধারণ মানুষ।

প্রশ্ন 3: ‘তবে তপনেরই বা লেখক হতে বাধা কী?’—তপনের মনে এমন ভাবনার উদয় হয়েছিল কেন? [মান: 3]

উত্তর: নতুন মেসোমশাইকে রক্তমাংসের সাধারণ মানুষ হিসেবে দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে দেখে তপন উপলব্ধি করে যে লেখক হতে কোনো অলৌকিক শক্তির প্রয়োজন হয় না। তপন শৈশব থেকেই প্রচুর গল্প শুনেছে এবং রাশি রাশি বই পড়েছে। তাই মেসোর মতো সাধারণ মানুষ পারলে সে নিজেও গল্প লিখতে পারবে—এই গভীর আত্মবিশ্বাস থেকেই তার এমন প্রত্যয় জন্মেছিল।

প্রশ্ন 4: ‘একাসনে বসে লিখেও ফেলল আস্ত একটা গল্প।’—তপন কীভাবে এবং কোথায় গল্পটি লিখেছিল? [মান: 3]

উত্তর: এক অলস গ্রীষ্মের দুপুরে যখন মামার বাড়ির সকলেই নিথর নিস্তব্ধ হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল, তখন তপন মা’র আনিয়ে দেওয়া হোম টাস্কের খাতা ও কলম নিয়ে একাকী তিনতলার নির্জন সিঁড়িতে উঠে যায়। একাগ্র চিত্তে কোনো প্রকার বিরতি ছাড়াই একাসনে বসে সে তার স্কুলে ভরতি হওয়ার দিনের রোমাঞ্চকর অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা নিয়ে আস্ত একটি গল্প লিখে শেষ করে।

প্রশ্ন 5: ‘লেখার পর যখন পড়ল, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল তপনের...’—তপনের এমন অনুভূতির কারণ ব্যাখ্যা করো। [মান: 3]

উত্তর: গল্পটি শেষ করে যখন তপন নিজে তা রিডিং পড়ল, তখন সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করল লেখাটি নিখুঁত ছাপার গল্পের মতোই সুখপাঠ্য ও যথাযথ হয়েছে। নিজের ভেতর লুকিয়ে থাকা সুপ্ত সাহিত্যপ্রতিভার প্রথম আত্মপ্রকাশ এবং নিজেই একটি সার্থক গল্পের স্রষ্টা হওয়ার তীব্র উত্তেজনায় তার গায়ে রোমাঞ্চের কাঁটা দিয়েছিল এবং মাথার চুল খাড়া হয়েছিল।

প্রশ্ন 6: ‘ছোটোমাসিই ওর চিরকালের বন্ধু...’—তপনের সঙ্গে ছোটোমাসির সম্পর্কটি কেমন ছিল? [মান: 3]

উত্তর: ছোটোমাসি বয়সে তপনের চেয়ে বছর আষ্টেকের বড়ো হলেও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল সমবয়সি ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো। মামার বাড়িতে এলে তপন সব আবদার, আবেগ ও মনের গোপন কথা ছোটোমাসিকেই সর্বাগ্রে জানাত। তাই প্রথম গল্প লেখার চরম আনন্দের মুহূর্তটিতে তপন কোনো দ্বিধা না রেখে সবার আগে ছোটোমাসির কাছেই ছুটে গিয়েছিল।

প্রশ্ন 7: ‘ওমা এ তো বেশ লিখেছিস রে? কোনোখান থেকে টুকলিফাই করিসনি তো?’—বক্তার এমন সন্দেহের কারণ কী ছিল? [মান: 3]

উত্তর: বক্তা ছোটোমাসি তপনের কাঁচা হাতের প্রথম লেখায় চমৎকার ভাষার বাঁধন ও সাবলীল ভাব প্রকাশ দেখে বিস্মিত হয়েছিল। এত অল্প বয়সে কোনো সাধারণ কিশোর এত পরিপক্ব গল্প লিখতে পারে কি না, সেই দ্বিধা ও স্বাভাবিক কৌতুকবশতই সে হালকা চালে তপনকে অন্যের লেখা নকল বা ‘টুকলিফাই’ করার কথা জিজ্ঞেস করেছিল।

প্রশ্ন 8: ‘রত্নের মূল্য জহুরির কাছেই।’—প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও। [মান: 3]

উত্তর: তপনের লেখা প্রথম গল্পটি ছোটোমাসি মেসোমশাইকে দেখাতে নিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে কথাটি বলা হয়েছে। জহুরি যেমন শত পাথরের ভিড়ে খাঁটি রত্নকে চিনে নিতে ভুল করে না, তেমনি একজন বিদগ্ধ ও প্রতিষ্ঠিত লেখক মেসোই একজন নতুন কিশোরের লেখার অন্তর্নিহিত সাহিত্যমূল্য ও মেধা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারবেন—এই বিশ্বাস থেকেই তপন এমনটি ভেবেছিল।

প্রশ্ন 9: ‘একটু ‘কারেকশান’ করে ইয়ে করে দিলে ছাপতে দেওয়া চলে।’—বক্তা কে? তাঁর এই মন্তব্যের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য কী ছিল? [মান: 3]

উত্তর: বক্তা তপনের নতুন মেসোমশাই। তিনি সদ্য বিবাহিত হয়ে শ্বশুরবাড়িতে এসেছিলেন। শ্বশুরবাড়ির একটি ছোট্ট কিশোরকে অহেতুক অপ্রস্তুত না করে খুশি রাখা এবং নিজের সামাজিক প্রভাব ও আভিজাত্য প্রকাশ করার তাগিদেই তিনি লেখাটিতে ‘কারেকশান’-এর মোড়কে সামান্য সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন।

প্রশ্ন 10: ‘তপন প্রথমটা ভাবে ঠাট্টা...’—তপন কেন মেসোর কথা ঠাট্টা ভেবেছিল এবং পরে তার কী পরিবর্তন হলো? [মান: 3]

উত্তর: নিজের লেখা গল্প একটি বিখ্যাত পত্রিকায় সত্যিই ছাপা হতে পারে—এমন অভাবনীয় সম্ভাবনা তপনের কাছে প্রথমটায় পরিহাস বা রসিকতা বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু মেসোমশাইয়ের মুখের আন্তরিক ও সদয় করুণার অভিব্যক্তি দেখে তপন নিঃসংশয় হয় এবং চরম আনন্দ ও কৃতজ্ঞতায় আবেগে কাঁদো কাঁদো হয়ে ওঠে।

প্রশ্ন 11: ‘বিকেলে চায়ের টেবিলে ওঠে কথাটা।’—কোন কথা এবং তা নিয়ে পরিবারের সদস্যদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? [মান: 3]

উত্তর: তপনের গল্প লেখা এবং মেসোমশাই কর্তৃক তা পত্রিকায় ছাপিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার বিষয়টি বিকেলে চায়ের আসরে উঠেছিল। বাড়ির অন্যান্যরা বিষয়টি শুনে এক কিশোরের লেখক হওয়ার অপচেষ্টা ভেবে হাসাহাসি ও তাচ্ছিল্য প্রকাশ করেছিল, যা পরিবারে নতুনদের সৃষ্টির প্রতি সনাতন উদাসীন মনোভাবকে তুলে ধরে।

প্রশ্ন 12: ‘নচেৎ এই বয়সের ছেলেমেয়েরা গল্প লিখতে গেলেই তো...’—মেসোর মতে এই বয়সের ছেলেমেয়েরা কী লিখে থাকে? [মান: 3]

উত্তর: মেসোমশাইয়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কিশোর বয়সে ছেলেমেয়েরা বাস্তবজীবন থেকে দূরে সরে গিয়ে অবাস্তব কল্পনার আশ্রয় নেয়। তারা সচরাচর রাজারানি, খুন-জখম, পথ দুর্ঘটনা কিংবা দারিদ্র্যের কারণে না খেতে পেয়ে অনাহারে মৃত্যুর মতো আরোপিত ও অতিনাটকীয় মালমশলা নিয়ে গল্প ফাঁদতে বসে, যা তাদের স্বকীয় অভিজ্ঞতার বাইরে।

প্রশ্ন 13: ‘তপন যে সেই দিকে যায়নি...’—তপনের গল্পের কোন বৈশিষ্ট্য মেসোমশাইকে আকৃষ্ট করেছিল? [মান: 3]

উত্তর: তপন কাল্পনিক রক্তারক্তি বা অবাস্তব রাজকাহিনির অন্ধ অনুকরণ না করে স্কুলে ভরতি হওয়ার দিনের নিজের খাঁটি অনুভূতি ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে সাহিত্যের উপজীব্য করেছিল। জীবনের বাস্তব মাটির স্পর্শ এবং সত্যনিষ্ঠ অভিজ্ঞতার প্রকাশ ঘটার কারণেই মেসোমশাই তপনের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করেছিলেন।

প্রশ্ন 14: ‘তপনের হাত আছে। চোখও আছে।’—এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে মেসোমশাই কী বোঝাতে চেয়েছেন? [মান: 3]

উত্তর: ‘হাত থাকা’ বলতে বোঝায় সাবলীল ও নিপুণ সাহিত্য রচনার সহজাত লেখনীশক্তি, আর ‘চোখ থাকা’ বলতে বোঝায় সূক্ষ্ম পারিপার্শ্বিক সমাজ ও অন্তর্জগৎ পর্যবেক্ষণের অন্তর্দৃষ্টি। তপনের লেখায় কৃত্রিমতার বদলে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার স্বাভাবিক প্রকাশ ঘটায় মেসো তার ভবিষ্যৎ সাহিত্যিক প্রতিভার সম্ভাবনা নিশ্চিত করেছিলেন।

প্রশ্ন 15: ‘তপন বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকায়।’—তপনের এই বিহ্বলতার কারণ কী ছিল? [মান: 3]

উত্তর: নিজের পরিবারের সদস্যরা যেখানে তপনের প্রতিভাকে হেসে উড়িয়ে দিচ্ছিল, সেখানে একজন কলেজ প্রফেসর ও প্রতিষ্ঠিত লেখক মেসোমশাই তাঁর লেখনী ও পর্যবেক্ষণের এমন উচ্চ প্রশংসা করায় তপন আত্মহারা হয়ে গিয়েছিল। অপ্রত্যাশিত স্বীকৃতি ও আনন্দে সে হতবাক হয়ে মেসোর দিকে তাকিয়ে ছিল।

প্রশ্ন 16: ‘তপন কৃতার্থ হয়ে বসে বসে দিন গোনে।’—তপন কৃতার্থ হয়েছিল কেন এবং সে কীসের দিন গুনছিল? [মান: 3]

উত্তর: মেসোমশাই তপনের গল্পটি সামান্য পরিমার্জন করে কলকাতার বিখ্যাত ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় ছাপিয়ে দেওয়ার ভার নিয়েছিলেন। নিজের অপটু সৃষ্টিকে একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক গুরুত্ব দিচ্ছেন দেখে তপন কৃতার্থ হয়েছিল এবং কখন গল্পটি ছাপা হয়ে প্রকাশিত হবে, সেই পরম শুভমুহূর্তটির জন্য দিন গুনছিল।

প্রশ্ন 17: ‘এদিকে বাড়িতে তপনের নাম হয়ে গেছে, কবি, সাহিত্যিক, কথাশিল্পী।’—তপনকে এমন নামকরণের কারণ কী ছিল? [মান: 3]

উত্তর: তপন একটি মৌলিক গল্প লিখে ফেলেছে এবং তা মেসোর মাধ্যমে ছাপাতে গেছে—এই খবর চাউর হতেই যৌথ পরিবারের গুরুজনেরা ও সমবয়সিরা তাকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে ‘কবি’, ‘সাহিত্যিক’ বা ‘কথাশিল্পী’ বলে কটাক্ষ করতে থাকে। এটি ছিল বাঙালি পরিবারের প্রচলিত স্নেহের মোড়কে উপহাসের প্রকাশ।

প্রশ্ন 18: ‘যেন নেশায় পেয়েছে।’—তপনকে কীসের নেশায় পেয়েছিল এবং তার কী পরিণতি হয়েছিল? [মান: 3]

উত্তর: তপনকে গল্প রচনার অমোঘ নেশায় পেয়েছিল। প্রথম গল্পটি লিখতে পারার পর তার সৃজনশীলতার দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়। চারপাশের তাচ্ছিল্য ও ব্যঙ্গকে অগ্রাহ্য করে এবং স্কুলের হোম টাস্ক ফেলে রেখে সে টেবিল-খাটের আড়ালে লুকিয়ে একের পর এক নতুন গল্প লিখতে শুরু করে।

প্রশ্ন 19: ‘বুকের রক্ত ছলকে ওঠে তপনের।’—কখন এবং কেন তপনের এমন প্রতিক্রিয়া হয়েছিল? [মান: 3]

উত্তর: দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মেসোমশাই ও ছোটোমাসি যখন একদিন তাদের বাড়িতে বেড়াতে আসেন এবং তপন তাঁদের হাতে ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকার একটি নতুন সংখ্যা দেখতে পায়, তখন তীব্র আশা ও রোমাঞ্চে তার বুকের রক্ত ছলকে উঠেছিল। সে বুঝেছিল তার জীবনের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন হয়তো সফল হয়েছে।

প্রশ্ন 20: ‘পৃথিবীতে এমন অলৌকিক ঘটনাও ঘটে?’—কোন ঘটনাকে কেন অলৌকিক বলা হয়েছে? [মান: 3]

উত্তর: তপনের মতো এক নিতান্তই সাধারণ স্কুলপড়ুয়া কিশোরের লেখা গল্প ‘সন্ধ্যাতারা’র মতো মান্যগণ্য পত্রিকায় ছাপার অক্ষরে আত্মপ্রকাশ করা এবং সূচিপত্রে নিজের নাম মুদ্রিত হওয়াকে তপনের কাছে এক অসম্ভব ও অবিশ্বাস্য ‘অলৌকিক’ ঘটনা বলে মনে হয়েছিল।

প্রশ্ন 21: ‘সূচিপত্রেও নাম রয়েছে।’—সূচিপত্রে কী লেখা ছিল এবং তা তপনের জীবনে কী তাৎপর্য বহন করছিল? [মান: 3]

উত্তর: সূচিপত্রে লেখা ছিল: ‘প্রথম দিন’ (গল্প) শ্রীতপন কুমার রায়। এটি ছিল তপনের সাহিত্যিক সত্তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সামাজিক স্বীকৃতি। নিজের নামকে ছাপার হরফে হাজার হাজার পাঠকের দরবারে পৌঁছে যেতে দেখে কিশোর মনের সমস্ত দ্বিধা আত্মবিশ্বাসে রূপ নিয়েছিল।

প্রশ্ন 22: ‘সারা বাড়িতে শোরগোল পড়ে যায়...’—শোরগোল পড়ার কারণ কী ছিল? [মান: 3]

উত্তর: তপনের কাঁচা হাতের লেখা গল্প বিখ্যাত ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় মেসোমশাই ছাপিয়ে এনেছেন—এই অভাবনীয় দৃশ্য দেখার পর গোটা পরিবারের সব স্তরের সদস্যের মধ্যে একযোগে তুমুল কৌতূহল, চাঞ্চল্য ও আনন্দের শোরগোল পড়ে যায়।

প্রশ্ন 23: ‘একট-আধটু ‘কারেকশান’ করতে হয়েছে অবশ্য।’—মেসোমশাইয়ের এই বিনম্র দাবির আসল রূপ কী ছিল? [মান: 3]

উত্তর: মেসোমশাই দাবি করেছিলেন যে কাঁচা হাতের লেখা হওয়ায় তিনি সামান্য সংশোধন করেছেন মাত্র। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি তপনের গল্পের মূল ভাষা ও আঙ্গিক সম্পূর্ণ বদলে দিয়ে নিজের পরিণত শৈলীতে গোটা গল্পটি নতুন করে লিখেছিলেন, যার ফলে তপনের নিজস্বতা সম্পূর্ণরূপে মুছে গিয়েছিল।

প্রশ্ন 24: ‘ক্রমশ ও কথাটাও ছড়িয়ে পড়ে।’—কোন কথাটা কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল? [মান: 3]

উত্তর: তপনের গল্পটি ছাপানোর পেছনে মেসোমশাইয়ের বিশাল অবদান এবং তাঁর ‘একটু-আধটু কারেকশান’-এর খবরটি গোটা পরিবারের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। এর ফলে গল্পটির সাহিত্যগুণকে ছাপিয়ে মেসোর অনুগ্রহ ও সংস্কারের কথাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

প্রশ্ন 25: ‘তা নইলে ফট করে একটা লিখল, আর ছাপা হলো,-’—বক্তার এই মন্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ কী? [মান: 3]

উত্তর: বক্তা তপনের বাবা। তিনি বলতে চেয়েছেন সাধারণ মেধা নিয়ে হঠাৎ একটি গল্প লিখে ফেললেই তা পত্রিকায় ছাপা হওয়া অসম্ভব। মেসোমশাইয়ের মতো নামকরা ব্যক্তির হাতযশ, পরিচয় ও সংশোধন ছাড়া তপনের মতো কাঁচা ছেলের সৃষ্টি কখনো আলোর মুখ দেখতে পারত না।

প্রশ্ন 26: ‘আমাদের থাকলে আমরাও চেষ্টা করে দেখতাম।’—মেজোকাকুর এই মন্তব্যে কী মানসিকতা প্রকাশ পায়? [মান: 3]

উত্তর: মেজোকাকুর মন্তব্যে একধরনের পরশ্রীকাতরতা, আত্মতুষ্টি এবং সৃষ্টির পরিশ্রমকে লঘু করার প্রবণতা প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন তপনের কোনো বাড়তি মেধা নেই; মেসোর মতো প্রভাবশালী যোগাযোগ থাকলে যে কেউ অনায়াসে সাহিত্যিক হয়ে উঠতে পারে।

প্রশ্ন 27: ‘তপন যেন কোথায় হারিয়ে যায় এইসব কথার মধ্যে।’—তপন কেন হারিয়ে গিয়েছিল? [মান: 3]

উত্তর: পত্রিকায় গল্প ছাপা হলেও গোটা বাড়িতে তপনের মেধা বা প্রতিভার কোনো মূল্যায়ন হচ্ছিল না। সমস্ত আলোচনা, প্রশংসা ও গৌরব বর্ষিত হচ্ছিল মেসোমশাইয়ের ‘কারেকশান’ ও তাঁর প্রভাবের ওপর। নিজের সৃষ্টির আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়ে তপন গভীর একাকিত্বে নিমজ্জিত হয়েছিল।

প্রশ্ন 28: ‘গল্প ছাপা হলে যে ভয়ংকর আহ্লাদটা হবার কথা, সে আহ্লাদ খুঁজে পায় না।’—আহ্লাদ হারিয়ে যাওয়ার কারণ কী? [মান: 3]

উত্তর: একটি কিশোরের প্রথম সৃষ্টি জনসমক্ষে আসার মুহূর্তটি সীমাহীন আনন্দের হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের কুৎসিত তাচ্ছিল্য এবং পুরো কৃতিত্ব মেসোমশাইয়ের ঝুলিতে চলে যাওয়ায় তপনের স্বকীয়তা ধূলিসাৎ হয়েছিল, ফলে তার কাঙ্ক্ষিত আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়েছিল।

প্রশ্ন 29: ‘কই তুই নিজের মুখে একবার পড় তো তপন শুনি!’—মা কেন তপনকে গল্পটি পড়তে বলেছিলেন? [মান: 3]

উত্তর: সন্তানের সাফল্যে গর্বিত মা আত্মীয়স্বজনের সামনে তপনের প্রতিভা প্রমাণ করতে এবং ছেলের নিজের কণ্ঠেই তার লেখা গল্পটি শুনে অপার তৃপ্তি লাভ করতে চেয়েছিলেন। মেসোর প্রশংসার পর মা তপনের অন্তরের সুপ্ত প্রতিভাকে সকলের কাছে উদ্ভাসিত করতে চেয়েছিলেন।

প্রশ্ন 30: ‘এর প্রত্যেকটি লাইন তো নতুন আনকোরা, তপনের অপরিচিত।’—তপনের এই আবিষ্কারের কারণ কী? [মান: 3]

উত্তর: নিজের লেখা গল্প জোরে পড়তে গিয়ে তপন হতবাক হয়ে লক্ষ্য করে যে ছাপার অক্ষরের ভাষা, বাক্যগঠন ও ভাবপ্রকাশের সঙ্গে তার আসল লেখার কোনো মিল নেই। মেসোমশাই সংশোধনের নামে তপনের অপটু অথচ খাঁটি ভাষা মুছে নিজের পাকা হাতের কৃত্রিম সাহিত্যভাষায় সবটা নতুন করে তৈরি করেছেন।

প্রশ্ন 31: ‘এর মধ্যে তপন কোথা?’—এই যন্ত্রণাদগ্ধ প্রশ্নের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো। [মান: 3]

উত্তর: প্রকাশিত গল্পের পৃষ্ঠায় নিজের নাম ‘শ্রীতপন কুমার রায়’ ছাপা থাকলেও রচনার ভেতরে তপনের নিজস্ব অনুভূতি, চিন্তা বা কিশোর মনের সারল্যের কোনো চিহ্নমাত্র ছিল না। এই শূন্যতাবোধ তপনকে বুঝিয়ে দেয় যে এটি তার সৃষ্টি নয়, বরং মেসোর প্রতিভার এক নির্দয় ছদ্মবেশ।

প্রশ্ন 32: ‘তপন আর পড়তে পারে না। বোবার মতো বসে থাকে।’—তপনের এই নিশ্চলতার কারণ কী ছিল? [মান: 3]

উত্তর: নিজের বলে যাকে জেনে এসেছে, তা অন্যের সৃষ্টি বলে ধরা পড়ার পর এক গভীর আত্মপ্রবঞ্চনা ও আত্মধিক্কারে তপন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। আত্মীয়স্বজনের মিথ্যে উচ্ছ্বাসের মুখে দাঁড়িয়ে সে না পারছিল সত্য প্রকাশ করতে, না পারছিল অন্যের লেখা নিজের বলে নির্লজ্জের মতো পড়ে যেতে।

প্রশ্ন 33: ‘তোর যে দেখি পায়া ভারী হয়ে গেল।’—কে, কখন তপনকে এই ধমক দিয়েছিল এবং কেন? [মান: 3]

উত্তর: তপনের মা তাকে এই ধমক দিয়েছিলেন। গল্পটি নিজের মুখে পড়তে গিয়ে তপন যখন স্তব্ধ ও বাকরুদ্ধ হয়ে বসেছিল, তখন মা তার মানসিক সংকট বুঝতে না পেরে ভেবেছিলেন অহংকারে বা অতিরিক্ত আদরে ছেলের দেমাগ বেড়ে গেছে, তাই সে কাউকে গ্রাহ্য করছে না।

প্রশ্ন 34: ‘তপন গড়গড়িয়ে পড়ে যায়। তপনের মাথায় ঢোকে না-সে কী পড়ছে।’—তপনের এমন মানসিক অবস্থার কারণ কী? [মান: 3]

উত্তর: মায়ের কঠোর ধমক এবং উপস্থিত আত্মীয়দের চাপ এড়াতে তপন একপ্রকার অন্ধ যান্ত্রিকতায় গল্পটি টানা পড়ে যায়। কিন্তু প্রতিটি বাক্য তার কাছে অপরিচিত ও আরোপিত হওয়ায় তার মন ও মস্তিষ্কের কোনো সংযোগ ছিল না; সে কেবল এক অপমানের বোঝা উচ্চারণ করে চলেছিল।

প্রশ্ন 35: ‘তবু ‘ধন্যি ধন্যি’ পড়ে যায়।’—কার উদ্দেশ্যে কেন এই ধন্যি ধন্যি পড়েছিল? [মান: 3]

উত্তর: তপনের পাঠ শেষ হলে উপস্থিত শ্রোতারা গল্পের গুণমুগ্ধ হয়ে মেসোমশাইয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে। কারণ সকলেই ধরে নিয়েছিল একজন কাঁচা অপদার্থ ছেলেকে মেসোমশাই তাঁর জাদুকরী কলমে সংশোধন করে যোগ্য লেখক বানিয়ে তুলেছেন।

প্রশ্ন 36: ‘তপন ছাতে উঠে গিয়ে শার্টের তলাটা তুলে চোখ মোছে।’—তপনের এই কান্নার স্বরূপ ব্যাখ্যা করো। [মান: 3]

উত্তর: তপনের এই অশ্রু কোনো শারীরিক কষ্টের নয়, বরং এক সংবেদনশীল কিশোরের আত্মসম্মান ভূলুণ্ঠিত হওয়ার নীরব রক্তক্ষরণ। মেসোর ছদ্ম-সহানুভূতি এবং পরিবারের অসচেতন ব্যঙ্গ তার সৃজনশীল সত্তাকে নির্মমভাবে হত্যা করায় সে লোকচক্ষুর অন্তরালে গিয়ে একাকী কেঁদেছিল।

প্রশ্ন 37: ‘তপনের মনে হয় আজ যেন তার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিন।’—সবচেয়ে আনন্দের দিনটি কেন সবচেয়ে দুঃখের দিনে পরিণত হলো? [মান: 3]

উত্তর: যেদিন তার প্রথম রচনা মুদ্রিত রূপ পেয়েছিল, সেদিনই সে জানল তার আসল লেখাটি বাতিল হয়ে গেছে এবং অন্যের ধার করা শব্দের বিনিময়ে সে মিথ্যা প্রশংসা পাচ্ছে। নিজের সৃষ্টি হারানোর এই অপূরণীয় ক্ষতি ও চরম আত্মপ্রবঞ্চনাই দিনটিকে তার জীবনের বিষাদতম দিনে পরিণত করেছিল।

প্রশ্ন 38: ‘যদি কখনো লেখা ছাপতে দেয় তো, তপন নিজে গিয়ে দেবে।’—তপনের এই সংকল্পের কারণ কী ছিল? [মান: 3]

উত্তর: মেসোমশাইয়ের কৃপায় লেখা ছাপাতে দিয়ে তপন যে চরম লাঞ্ছনা ও স্বকীয়তা হারানোর মুখোমুখি হয়েছিল, তা তাকে জীবনের এক বড় শিক্ষা দিয়েছিল। পরের অনুগ্রহে নয়, নিজের পরিশ্রমে ও আত্মমর্যাদার জোরে সাহিত্যজগতে পা রাখার আত্মপ্রত্যয় থেকেই সে এই সংকল্প গ্রহণ করেছিল।

প্রশ্ন 39: ‘নিজের কাঁচা লেখা। ছাপা হয় হোক, না হয় না হোক।’—উদ্ধৃতিটিতে তপনের কোন মনোভাবের পরিচয় মেলে? [মান: 3]

উত্তর: এখানে তপনের আপসহীন সততা এবং আত্মমর্যাদাবোধের প্রকাশ ঘটেছে। সে বুঝেছে কৃত্রিম পূর্ণতার চেয়ে নিজের অপূর্ণ ও কাঁচা সৃষ্টির আন্তরিকতাই সত্য। অন্যের কলমের চাদর গায়ে দিয়ে বড় হওয়ার চেয়ে নিজের দুর্বলতা নিয়ে টিকে থাকা অনেক বেশি সম্মানজনক।

প্রশ্ন 40: ‘তপনকে যেন আর কখনো শুনতে না হয় ‘অমুক তপনের লেখা ছাপিয়ে দিয়েছে’।’—এই বেদনাবোধের কারণ কী? [মান: 3]

উত্তর: তপন উপলব্ধি করেছিল যে মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে পাওয়া সাফল্য কোনোদিন স্রষ্টার নিজস্ব হতে পারে না। সমাজ তখন স্রষ্টার মেধার চেয়ে সুপারিশকারীর প্রতিপত্তিকেই বড় করে দেখে। এই পরাধীন প্রশংসার হীনমন্যতা থেকে মুক্তি পেতেই তপন এমন পণ করেছিল।

প্রশ্ন 41: ‘তার চেয়ে দুঃখের কিছু নেই, তার থেকে অপমানের!’—কোন বিষয়টিকে তপন সবচেয়ে বড় দুঃখ ও অপমানের বলে মনে করেছে? [মান: 3]

উত্তর: নিজের সৃষ্টি বলে পরিচয় দিয়ে সাহিত্যমঞ্চে বা পারিবারিক আসরে অন্যের লেখা লাইন পাঠ করার গ্লানিকে তপন জগতের সবচেয়ে অসহনীয় দুঃখ ও চরম আত্মমর্যাদাহানিকর অপমান বলে চিহ্নিত করেছে।

প্রশ্ন 42: ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে তপনের দুটি ভিন্ন মাত্রার ‘জ্ঞানচক্ষু’ কীভাবে উন্মীলিত হয়েছিল? [মান: 3]

উত্তর: প্রথমবার নতুন মেসোকে সাধারণ মানুষের মতো প্রাত্যহিক আচরণ করতে দেখে তপনের বাস্তবদৃষ্টি খুলেছিল—সে জেনেছিল লেখকেরা মানুষ। আর দ্বিতীয়বার নিজের পরিবর্তিত গল্প পড়ে এবং মেসোর করুণার রূপ দেখে তার অন্তরের আত্মমর্যাদা ও স্রষ্টার স্বাধীন সত্তারূপী প্রকৃত ‘জ্ঞানচক্ষু’ উন্মোচিত হয়েছিল।

প্রশ্ন 43: আশাপূর্ণা দেবীর রচনার মূল বিষয়বস্তু ও বৈশিষ্ট্য কী ছিল? [মান: 3]

উত্তর: আশাপূর্ণা দেবীর রচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের পারিবারিক অন্তঃপুর, মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, নারীর অধিকার ও আত্মসম্মানবোধ। প্রথাগত উচ্চশিক্ষা না থাকলেও সমাজের প্রতি তাঁর অসামান্য সূক্ষ্ম দৃষ্টি ও তীব্র সংবেদনশীলতা তাঁর লেখাকে বাস্তবনিষ্ঠ ও কালোত্তীর্ণ করেছে।

প্রশ্ন 44: আশাপূর্ণা দেবীর প্রধান সাহিত্যিক কীর্তি হিসেবে কোন উপন্যাস ত্রয়ীকে গণ্য করা হয় এবং কেন? [মান: 3]

উত্তর: ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’, ‘সুবর্ণলতা’ এবং ‘বকুলকথা’—এই ত্রয়ী উপন্যাস লেখিকার প্রধান সাহিত্যকীর্তি। কারণ এর মধ্য দিয়ে তিনি তিন প্রজন্মের নারীদের সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, আত্মজাগরণ, ব্যক্তিত্বের লড়াই এবং মূল্যবোধের ক্রমবিবর্তনকে মহাকাব্যিক রূপ দিয়েছেন।

প্রশ্ন 45: ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পটিতে ছোটোদের মানসিক জগতের কোন দিকটি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে? [মান: 3]

উত্তর: কিশোরদের আবেগপ্রবণতা, সৃষ্টির তীব্র আকাঙ্ক্ষা, স্বীকৃতি পাওয়ার ব্যাকুলতা এবং একই সঙ্গে তাদের গভীর আত্মসম্মানবোধ ও সংবেদনশীলতা গল্পটিতে অসাধারণ সূক্ষ্মতায় চিত্রিত হয়েছে। বড়দের আত্মম্ভরিতা কীভাবে নিঃশব্দে এক কিশোরের কোমল মনকে ক্ষতবিক্ষত করে, তা এখানে স্পষ্ট।

প্রশ্ন 46: ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে মেসোমশাই চরিত্রটির মাধ্যমে লেখক সমাজের কোন শ্রেণিকে ব্যঙ্গ করেছেন? [মান: 3]

উত্তর: মেসোমশাইয়ের মাধ্যমে লেখক সমাজের সেইসব উন্নাসিক ও আত্মতুষ্ট বুদ্ধিজীবীদের ব্যঙ্গ করেছেন, যাঁরা স্নেহের ছদ্মবেশে অন্যের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেন এবং নিজের আভিজাত্য প্রকাশ করতে গিয়ে একজন নবীন প্রতিভার স্বকীয়তাকে নির্দ্বিধায় ধ্বংস করে ফেলেন।

প্রশ্ন 47: ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে ছোটোমাসির চরিত্রটি কীভাবে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে? [মান: 3]

উত্তর: ছোটোমাসি ছিল তপনের শৈশবের খেলার সাথি ও ভরসাস্থল। তার উৎসাহেই তপনের লেখা মেসোর কাছে পৌঁছেছিল, আবার বিয়ের পর ছোটোমাসির মানসিক পরিবর্তন ও মেসোর মহত্ত্ব প্রচারের মধ্য দিয়ে সে অজান্তেই তপনের অপমানের অন্যতম অনুঘটক হয়ে উঠেছিল।

প্রশ্ন 48: ‘হোম টাস্কের খাতা আর কী!’—উদ্ধৃতিটির মধ্য দিয়ে তপনের কোন বাস্তবতা ফুটে উঠেছে? [মান: 3]

উত্তর: এখানে তপনের একাধারে সাধারণ ছাত্রজীবনের কঠোর বাস্তব ও তার মধ্যকার সৃজনশীল সত্তার টানাপোড়েন ফুটে উঠেছে। মামার বাড়িতে ছুটি কাটাতে এলেও পড়ালেখার শাসন তার পিছু ছাড়েনি, আর সেই কঠোর পাঠ্যবইয়ের খাঁচায় লুকিয়েই সে সাহিত্যের মুক্ত ডানায় উড়তে চেয়েছিল।

প্রশ্ন 49: ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পের সমাপ্তি দৃশ্যটি পাঠকের মনে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে? [মান: 3]

উত্তর: গল্পের শেষ দৃশ্যে ছাদের নির্জনতায় দাঁড়িয়ে থাকা তপনের চোখের জল ও দৃঢ় সংকল্প পাঠককে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এক অপাপবিদ্ধ কিশোরের মোহভঙ্গের মধ্য দিয়ে গল্পটি কেবল করুণায় শেষ হয় না, বরং আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন এক প্রকৃত স্বাধীন সাহিত্যিকের পুনর্জন্মের বার্তা দিয়ে আশাবাদী সমাপ্তি টানে।

প্রশ্ন 50: ছোটোগল্প হিসেবে ‘জ্ঞানচক্ষু’ নামকরণের সার্থকতা সংক্ষেপে লেখো। [মান: 3]

উত্তর: ‘জ্ঞানচক্ষু’ কথাটির অর্থ আত্মিক চেতনার উন্মেষ। গল্পটিতে তপন বাহ্যিক দৃষ্টিতে লেখক চেনার পর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে আত্মপ্রবঞ্চনা ও পরনির্ভরতার অন্ধকার চিনে আত্মনির্ভরতার সংকল্পে উপনীত হয়। চরিত্রটির এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ও চেতনার উত্তরণ ঘটায় গল্পের নামকরণ সার্থক ও ব্যঞ্জনাময়।

বিভাগ গ: বিশ্লেষণধর্মী ও বড়ো প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫) — মোট ২০টি

প্রশ্ন 1: ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্প অবলম্বনে তপন চরিত্রটির মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য বিস্তারিত বিশ্লেষণ করো। [মান: 5]

উত্তর: আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র তপন এক সংবেদনশীল ও প্রতিভাবান কিশোর। তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রধান দিকগুলি হলো:
১. সাহিত্যপ্রীতি ও কৌতূহল: তপন সাধারণ কিশোরদের চেয়ে আলাদা। ছেলেবেলা থেকেই সে প্রচুর গল্প শুনেছে ও পড়েছে। লেখকদের প্রতি তার অসীম কৌতূহল ছিল।
২. পর্যবেক্ষণক্ষমতা ও বাস্তববাদিতা: সমবয়সিদের মতো রাজা-রানি বা রক্তারক্তির কল্পনায় না ভেসে সে স্কুলে ভরতির বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে প্রথম গল্প লেখে।
৩. আবেগ ও নিষ্পাপ সারল্য: ছোটোমেসো গল্প ছাপিয়ে দেওয়ার কথা বললে সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় এবং ছোটোমাসির সঙ্গে তার সম্পর্ক গভীর বন্ধুত্বের।
৪. আত্মমর্যাদাবোধ ও অহংকারহীনতা: যখন সে দেখে মেসো তার গল্পের প্রতিটি লাইন বদলে দিয়েছেন, তখন সে মিথ্যা প্রশংসায় উল্লসিত না হয়ে গভীর বেদনায় স্তব্ধ হয়ে যায়।
৫. সংকল্প ও স্বাবলম্বন: অন্তিমে সে নিজের শক্তিতে দাঁড়ানোর এবং আত্মনির্ভরশীল হওয়ার কঠিন প্রতিজ্ঞা নেয়।
পরিশেষে, তপন কেবল একটি গল্পপড়ুয়া বালক নয়, বরং আত্মসম্মান ও সৃজনশীলতার প্রতীক।

প্রশ্ন 2: ‘নতুন মেসোকে দেখে জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল তপনের।’—তপনের এই প্রাথমিক জ্ঞানচক্ষু উন্মীলন এবং গল্পের শেষে প্রকৃত জ্ঞানচক্ষু উন্মীলনের তুলনামূলক আলোচনা করো। [মান: 5]

উত্তর: আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে তপনের চেতনার উন্মেষ ঘটেছে দুটি ভিন্ন স্তরে:
১. বাহ্যিক জ্ঞানচক্ষুর উন্মীলন (প্রাথমিক স্তর): গল্পের সূচনায় তপন লেখকদের সাধারণ মানুষের অতীত কোনো অলৌকিক প্রাণী ভাবত। কিন্তু নতুন মেসোমশাইকে প্রতিদিনের আটপৌরে কাজ—দাড়ি কামানো, খাবার আধখানা ফেলে দেওয়া, খবরের কাগজ নিয়ে তর্ক করা এবং সিনেমা দেখতে যেতে দেখে তপন বুঝল লেখকেরা আমাদের মতোই সাধারণ মানুষ। এটি ছিল তার বাহ্যিক ও কৌতূহলভিত্তিক বিভ্রান্তি মোচন।
২. আত্মিক ও মানসিক জ্ঞানচক্ষুর উন্মীলন (চূড়ান্ত স্তর): গল্পের শেষে যখন তপন দেখল তার বহু আকাঙ্খিত ছাপা গল্পে তার নিজের কোনো বাক্য নেই, মেসো নিজের দক্ষতায় সবটাই নতুন করে লিখেছেন এবং বাড়ির সবাই তপনের বদলে মেসোর দয়াকেই মহিমান্বিত করছে, তখন তপনের আসল চেতনার চোখ খোলে। সে বোঝে পরের অনুগ্রহে মেধা কেনা যায় না, নিজের কাঁচা লেখা অন্যের পাকা লেখার চেয়ে অনেক বেশি সম্মানের। এই বোধই তার প্রকৃত অন্তর্নিহিত জ্ঞানচক্ষুর উন্মেষ ঘটায়।

প্রশ্ন 3: ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্প অবলম্বনে নতুন মেসোমশাই চরিত্রটির স্ববিরোধিতা ও আচরণ বিশ্লেষণ করো। [মান: 5]

উত্তর: আশাপূর্ণা দেবী ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে নতুন মেসোমশাই চরিত্রটিকে একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক ও কলেজ অধ্যাপকের পাশাপাশি সামাজিক আত্মম্ভরিতার প্রতিভূ হিসেবে চিত্রিত করেছেন:
১. বাহ্যিক উদারতা ও পৃষ্ঠপোষকতা: শ্বশুরবাড়িতে এসে নতুন মেসো তপনের লেখা গল্পের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেন এবং সমবয়সিদের তুলনায় তার বিষয় নির্বাচনের অভিনবত্বকে স্বীকৃতি দেন। তিনি গল্পটি ‘সন্ধ্যাতারা’য় ছাপিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও নেন।
২. করুণার প্রদর্শন: তিনি তপনের প্রতি সদয় মনোভাব দেখিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন যে তিনি নিজে না থাকলে এই লেখা কেউ স্পর্শ করত না। তাঁর এই মহত্ত্ব প্রকাশের পেছনে অহমিকা কাজ করেছিল।
৩. স্ববিরোধিতা ও অসততা: মুখে ‘একটু-আধটু কারেকশান’-এর কথা বললেও তিনি মূলত তপনের অপটু কিশোর-মনটিকে নির্মমভাবে হত্যা করে নিজের পাকা হাতে গল্পটি নতুন করে লিখে ফেলেন। একজন শিক্ষক ও সাহিত্যিক হয়েও একজন নবীন প্রতিভার মৌলিকতাকে এভাবে মুছে দেওয়া তাঁর চরিত্রের বড় স্খলন।
সুতরাং, মেসোমশাই চরিত্রটি শুভাকাঙ্ক্ষীর মুখোশে এক উন্নাসিক ব্যক্তিত্ব, যিনি অজান্তেই এক শিশুর সৃজনশীল আত্মাকে আঘাত করেছিলেন।

প্রশ্ন 4: ‘সূচিপত্রেও নাম রয়েছে। ‘প্রথম দিন’ (গল্প) শ্রীতপন কুমার রায়।’—তপনের এমন অনুভূতির প্রেক্ষাপট এবং পরিণাম বর্ণনা করো। [মান: 5]

উত্তর: উৎস ও প্রেক্ষাপট: আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে ছোটোমেসো ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় তপনের প্রথম গল্পটি ছাপিয়ে নিয়ে আসার পর এই চরম প্রত্যাশিত দৃশ্যটি দেখা যায়। নিজের নাম ছাপার হরফে দেখে তপনের মনে হয়েছিল পৃথিবীতে বুঝি অলৌকিক ঘটনাও সত্যি হয়। হাজার হাজার অচেনা পাঠকের হাতে তার সৃষ্টি পৌঁছাবে—এই ভাবনায় তপন সীমাহীন গর্ব ও পুলক অনুভব করেছিল।
পরবর্তী পরিণাম: কিন্তু এই আনন্দ স্থায়ী হয়নি। পত্রিকাটি হাতে নিয়ে মা যখন তাকে সবার সামনে গল্পটি জোরে পড়তে বলেন, তখন চরম ট্র্যাজেডি নেমে আসে। তপন দেখে গল্পের বাক্য, ভাষা ও শৈলী সবই তার অপরিচিত; মেসোমশাই কারেকশানের নামে তার সমগ্র লেখাটি নিজের মতো করে নতুন করে লিখে দিয়েছেন। তপনের নিজস্বতা কোথাও অবশিষ্ট নেই। ধিক্কারে, অপমানে তপনের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায়। জীবনের সবচেয়ে সুখের দিনটি চোখের জলে তার জীবনের সবচেয়ে বিষাদময় দিনে পরিণত হয়।

প্রশ্ন 5: ‘তপনের মনে হয় আজ যেন তার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিন।’—তপনের এই গভীর দুঃখবোধের কারণ এবং তার মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া বিশদ করো। [মান: 5]

উত্তর: কারণসমূহ:
১. স্বকীয়তা হরণের যন্ত্রণা: নিজের মৌলিক লেখা পড়তে গিয়ে তপন দেখে প্রতিটি লাইন মেসোমশাইয়ের দ্বারা সম্পূর্ণ পুনর্লিখিত। তপনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও শৈশব সেখানে নিখোঁজ।
২. আত্মপ্রবঞ্চনা ও কপটতা: অন্যের লেখা লাইনকে নিজের বলে পরিবারের সামনে পাঠ করার বাধ্যবাধকতা তপনের আত্মমর্যাদাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল।
৩. মেসোর মহত্ত্বের দাপট: পরিবারের সকলেই তপনের লেখাকে লঘু করে মেসোমশাইয়ের প্রভাব ও দয়ার জয়গান গাইতে থাকে। তপন যেন সম্পূর্ণ অনাবশ্যক এক ছায়ামাত্রে পরিণত হয়।
মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া: তপন আর ঘরে থাকতে পারে না। সে বই ফেলে নির্জন ছাদে ছুটে যায়। সেখানে একাকী শার্টের খুঁট দিয়ে চোখ মোছে। এই নীরব কান্না তাকে ভেঙে পড়তে দেয়নি, বরং তার ভেতরে এক কঠিন ইস্পাতদৃঢ় সংকল্পের জন্ম দেয়—ভবিষ্যতে কারও করুণার ওপর ভর করে নয়, নিজের সৃষ্টি দিয়েই সে সমাজে মাথা তুলে দাঁড়াবে।

প্রশ্ন 6: ‘যদি কখনো লেখা ছাপতে দেয় তো, তপন নিজে গিয়ে দেবে।’—তপনের এই প্রতিজ্ঞার তাৎপর্য এবং এর মধ্যে দিয়ে পরিস্ফুট জীবনদর্শন আলোচনা করো। [মান: 5]

উত্তর: আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পের সমাপ্তিতে তপনের এই সংকল্পটি এক রূপান্তরের স্মারক:
১. আত্মনির্ভরশীলতার ডাক: তপন বুঝেছিল মধ্যস্থতাকারী যতই শক্তিশালী হোক, তাদের অনুগ্রহে পাওয়া গৌরব আসলে ভিক্ষার সমান। নিজের যোগ্যতায় কোনো সাফল্য অর্জন না করলে তাতে আত্মতৃপ্তি থাকে না।
২. মেধার প্রতি শ্রদ্ধা: তপন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় পণ করে, ‘নিজের কাঁচা লেখা। ছাপা হয় হোক, না হয় না হোক।’ অর্থাৎ সাহিত্যের জগতে অপটু হলেও সত্যনিষ্ঠ হওয়া জরুরি। অন্যের পালিশ করা মিথ্যার চেয়ে নিজের অসম্পূর্ণ সত্য অনেক বেশি মূল্যবান।
৩. পরাধীনতার গ্লানি মোচন: ‘অমুক তপনের লেখা ছাপিয়ে দিয়েছে’—এই দাসত্বমূলক প্রশংসার বোঝা সে আর বইবে না।
জীবনদর্শন: এই প্রতিজ্ঞার মাধ্যমে তপন কেবল একজন অভিমানী কিশোর থেকে পরিণত এক শিল্পীতে রূপান্তরিত হয়। স্বাবলম্বন, আত্মশ্রদ্ধা এবং সৃষ্টির প্রতি অবিচল বিশ্বস্ততাই যে একজন মানুষের জীবনের প্রধান অবলম্বন—তপনের এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে লেখিকা সেই শাশ্বত দর্শনকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

প্রশ্ন 7: ‘জ্ঞানচক্ষু’ ছোটোগল্পটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। [মান: 5]

উত্তর: সাহিত্যে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিল্পরূপ। আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পটির নামকরণ ব্যঞ্জনামূলক ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ:
১. শাব্দিক অর্থ: ‘জ্ঞানচক্ষু’ শব্দের অর্থ অন্তর্দৃষ্টি বা প্রজ্ঞার চোখ, যা দিয়ে মানুষের বাইরের রূপ নয়, সত্যের মর্ম উপলব্ধি করা যায়।
২. প্রথম জ্ঞানচক্ষুর উন্মোচন: তপন ভাবত লেখকেরা অলৌকিক কোনো সত্তা। কিন্তু রক্তমাংসের নতুন মেসোকে আটপৌরে জীবনযাপন করতে দেখে তপনের প্রথম ভ্রম ভাঙে এবং সে বোঝে লেখকরাও সাধারণ মানুষ। এটি ছিল তার স্থূল বা প্রাথমিক জ্ঞানচক্ষুর উন্মোচন।
৩. দ্বিতীয় বা প্রকৃত জ্ঞানচক্ষুর উন্মোচন: গল্পের চরম মুহূর্তে যখন মেসোর কারেকশান করা অচেনা গল্প পাঠ করতে গিয়ে তপন চরম অপমান ও লাঞ্ছনার মুখোমুখি হয়, তখন তার অন্তরাত্মার প্রকৃত চোখ খোলে। সে উপলব্ধি করে পরের দয়ায় খ্যাতি অর্জনের চেয়ে নিজের স্বকীয়তা বিসর্জন দেওয়া কত বড় পাপ। আত্মমর্যাদাই স্রষ্টার মূল চালিকাশক্তি।
তপনের এই মোহভঙ্গ এবং আত্মোপলব্ধির মধ্য দিয়ে গল্পের অন্তর্নিহিত ভাববস্তু ফুটে উঠেছে বলে ‘জ্ঞানচক্ষু’ নামকরণটি সর্বতোভাবে সার্থক ও শিল্পসম্মত।

প্রশ্ন 8: ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে আশাপূর্ণা দেবী কীভাবে মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের মনস্তত্ত্ব ও পারিবারিক চিত্র অঙ্কন করেছেন? [মান: 5]

উত্তর: ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে আশাপূর্ণা দেবী মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের খাঁটি চালচিত্র নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন:
১. সাহিত্য সম্পর্কে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি: মধ্যবিত্ত পরিবারে সাহিত্যচর্চাকে ছেলেমানুষি বা অলীক বিলাসিতা ভাবা হয়। তপন যখন গল্প লেখে, তখন বাড়ির সকলে তাকে উৎসাহ দেওয়ার বদলে ‘কবি’, ‘সাহিত্যিক’ বলে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে।
২. প্রভাব ও যোগাযোগের তোষণ: সমাজে মেধার চেয়ে প্রভাবের কদর বেশি। তপনের গল্প ছাপা হওয়ার পর বাবা ও মেজোকাকু বলেন মেসোর সুপারিশ ছাড়া কাঁচা লেখা কেউ ছুঁতো না। ‘আমাদের মেসো থাকলে আমরাও লিখতাম’—এই উক্তিতে পরশ্রীকাতরতা ও তেল মারার মানসিকতা স্পষ্ট।
৩. মেয়েদের পরিবর্তন ও ঘরোয়া সংস্কৃতি: ছোটোমাসি বিয়ে হয়ে একটু মুরুব্বি ভাব দেখায়, আবার স্বামীর মহত্ত্বে গর্বিত হয়ে আয়েশ করে চা ও ডিম ভাজা খায়। মা ছেলের সাফল্যে গর্ববোধ করেও নিজের অহমিকা দেখাতে বাধ্য করেন।
৪. নবীন প্রতিভার অবমূল্যায়ন: বড়দের আত্মকেন্দ্রিকতা কীভাবে নিঃশব্দে একটি শিশুর সুকুমার বৃত্তিকে অবদমিত করে, লেখিকা তা সমাজবাস্তবতার নিরিখে নির্মোহভাবে তুলে ধরেছেন।

প্রশ্ন 9: ‘রত্নের মূল্য জহুরির কাছেই।’—কথাটির তাৎপর্য কী? গল্পে জহুরি ও রত্নের রূপকটি শেষ পর্যন্ত কীভাবে উল্টে গিয়েছিল? [মান: 5]

উত্তর: রূপকার্থের ব্যাখ্যা: প্রবাদ অনুযায়ী খাঁটি জহুরি যেমন শত কাচের ভিড়ে আসল হিরে চিনে নিতে পারে, তেমনি একজন প্রথিতযশা লেখক মেসোমশাই তপনের কাঁচা সৃষ্টির প্রকৃত সাহিত্যমূল্য চিনতে পারবেন—এই ভরসা থেকেই তপন তাকে ‘জহুরি’ এবং নিজের সৃষ্টিকে ‘রত্ন’ মনে করেছিল।
রূপকের বিপরীত পরিণতি:
১. জহুরির প্রকৃত ব্যর্থতা: মেসোমশাই মুখে তপনের পর্যবেক্ষণের প্রশংসা করলেও কার্যত তিনি জহুরির ধর্ম পালন করেননি। খাঁটি জহুরি রত্নকে ঘষেমেজে তার রূপ বাড়ায়, কিন্তু বদলে দিয়ে কৃত্রিম পাথর বসায় না। মেসোমশাই তপনের লেখার সমস্ত মৌলিক সারল্য ধ্বংস করে নিজের পাকা ভাষায় নতুন লেখা প্রতিস্থাপন করেন।
২. তপনের আসল রূপ আবিষ্কার: গল্পের শেষে তপনই প্রমাণ করে সে খাঁটি রত্ন। মেসোর দয়ার ফাঁকি সে ধরে ফেলে এবং আত্মসম্মানের তাগিদে সেই ধার করা স্বীকৃতি ছুড়ে ফেলে দেয়।
সুতরাং, মেসো নামের তথাকথিত ‘জহুরি’ তার আত্মতুষ্টিতে পরাজিত হন, আর তপন নামের ‘রত্ন’ অপমানের কষ্টিপাথরে যাচাই হয়ে আসল সোনা হয়ে ওঠে।

প্রশ্ন 10: ‘এর মধ্যে তপন কোথা?’—তপন কেন এই শূন্যতা অনুভব করেছিল? এই শূন্যতাবোধ কীভাবে তাকে পরিণত মানুষে রূপ দিল? [মান: 5]

উত্তর: শূন্যতাবোধের উৎস: নিজের মুখে প্রথম গল্পটি পড়ার জন্য যখন তপন ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকাটি খোলে, তখন সে স্তম্ভিত হয়ে দেখে গল্পের প্রতিটি বাক্য, শব্দচয়ন ও প্রকাশভঙ্গি তার সম্পূর্ণ অচেনা। স্কুলের ভরতি হওয়ার দিনের তার সেই আবেগ, অপটু ব্যাকুলতা সব মুছে দিয়ে মেসোমশাই এক প্রবীণ লেখকের কৃত্রিম চাতুর্য দিয়ে পাতা ভরিয়ে দিয়েছেন। সূচিপত্রে নাম তপনের থাকলেও রচনার আত্মায় তপন সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল। এই নিদারুণ বিচ্ছেদই তপনের মনে এই শূন্যতার জন্ম দেয়।
পরিণত মানুষে রূপান্তর: এই আঘাত তপনের সমস্ত কিশোরসুলভ অন্ধবিশ্বাসকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। সে বুঝতে পারে:
- মেসোমশাইয়ের দয়া আসলে এক নিষ্ঠুর আত্মপ্রচার।
- পরিবারের বাহবা আসলে মেসোর প্রতিপত্তির স্তাবকতা, তপনের প্রতিভার নয়।
এই চরম বোধোদয় তাকে এক লহমায় পরিপক্ব করে তোলে। সে আর অন্যের মুখাপেক্ষী না থেকে নিজের অপূর্ণতা নিয়েই একক লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়, যা তাকে এক আত্মসচেতন ও পরিণত স্রষ্টায় রূপান্তরিত করে।

প্রশ্ন 11: ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্প অবলম্বনে ছোটোমাসি চরিত্রটির ভূমিকা ও তার আচরণগত বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো। [মান: 5]

উত্তর: ছোটোমাসি ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পের এক অবিচ্ছেদ্য চরিত্র, যার মাধ্যমে গল্পের গতিপ্রকৃতি বহুলাংশে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে:
১. তপনের আজীবন বন্ধু: বয়সে বছর আষ্টেকের বড়ো হলেও ছোটোমাসি ছিল তপনের শৈশবের পরম খেলার সাথি ও মনের আস্থার জায়গা। তপন প্রথম গল্পটি লেখার চরম উত্তেজনা ছোটোমাসির সঙ্গেই প্রথম ভাগ করে নিয়েছিল।
২. নতুন বৈবাহিক জীবনের পরিবর্তন: বিয়ে হওয়ার পর ছোটোমাসির মধ্যে স্বভাবসুলভ কিছু গাম্ভীর্য ও ‘মুরুব্বি মুরুব্বি’ ভাব চলে আসে। সে তপনকে টুকলিফাই করার কথা বলে হালকা শাসনও করে।
৩. উৎসাহী মধ্যস্থতাকারী: মেসোর ঘুম ভাঙিয়ে তপনের গল্পটি তুলে দিয়ে সে তার মেধার স্বীকৃতি পাইয়ে দিতে সচেষ্ট হয়েছিল।
৪. মেসোর মহত্ত্বের অহংকার: গল্পের শেষাংশে ছোটোমাসি তপনের অপমানের প্রতি সংবেদনশীল না হয়ে স্বামীর কারেকশানের মহিমা ও তাঁর প্রতিপত্তির তৃপ্তিতে আত্মহারা হয়ে ডিম ভাজা ও চা উপভোগ করে।
পরিশেষে বলা যায়, ছোটোমাসি কোনো খলনায়িকা নয়, বরং এক চিরন্তন মধ্যবিত্ত তরুণী, যার আচরণে একদিকে স্নেহের উচ্ছ্বাস এবং অন্যদিকে সামাজিক অহমিকার স্বাভাবিক টানাপোড়েন ফুটে উঠেছে।

প্রশ্ন 12: ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে তপনের প্রথম গল্প রচনার মুহূর্তটির বর্ণনা দাও। এই ঘটনাটি তার জীবনে কী পরিবর্তন এনেছিল? [মান: 5]

উত্তর: রচনার মুহূর্ত: মামার বাড়িতে এক শান্ত, নির্জন দুপুরে যখন সবাই ঘুমে অচেতন, তখন তপন বাড়ির সকলের চোখের আড়ালে হোম টাস্কের খাতা ও কলম নিয়ে তিনতলার নির্জন সিঁড়িতে গিয়ে বসে। এক গভীর তন্ময়তা নিয়ে সে একাসনে বসেই স্কুলের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি আস্ত গল্প লিখে ফেলে। গল্পটি শেষ করে যখন সে পড়ে, তখন রোমাঞ্চে তার গায়ে কাঁটা দেয় এবং মাথার চুল খাড়া হয়ে ওঠে। সে আবিষ্কার করে এ যেন হুবহু সত্যি গল্পের মতোই হয়েছে।
জীবনের পরিবর্তন:
১. আত্মবিশ্বাসের স্ফুরণ: নিজেকে আর পাঁচটা সাধারণ ছেলের চেয়ে আলাদা ভেবে সে নিজেকে একজন ‘লেখক’ বলে ভাবতে শুরু করে।
২. সাহিত্যসৃষ্টির উন্মাদনা: পরিবারের ঠাট্টা-বিদ্রূপকে তুচ্ছ করে সে হোম টাস্ক ভুলে একের পর এক নতুন গল্প রচনার নেশায় মেতে ওঠে।
৩. মোহভঙ্গের প্রস্তুতি: এই প্রথম সৃষ্টির আবেগই তাকে পরবর্তীকালে সাহিত্যের আসল সত্য ও আত্মমর্যাদার নির্মম পাঠ শেখাতে সাহায্য করেছিল।

প্রশ্ন 13: ‘যেন নেশায় পেয়েছে।’—উদ্ধৃতিটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো। পরিবারের ব্যঙ্গ সত্ত্বেও তপনের সাহিত্যসাধনা কীভাবে এগিয়েছিল? [মান: 5]

উত্তর: ‘নেশায় পাওয়া’ কথাটি মানুষের এমন এক মানসিক অবস্থাকে নির্দেশ করে, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট কর্মে মানুষ সর্বস্ব ভুলে নিমগ্ন থাকে। তপনের ক্ষেত্রে এটি ছিল গল্প লেখার অনির্বাণ সৃজনশীল নেশা।
সাহিত্যসাধনার বিকাশ:
১. প্রতিকূল পরিবেশ: প্রথম গল্পটি মেসো নিয়ে যাওয়ার পর বাড়িতে তপনকে নিয়ে তীব্র তামাশা শুরু হয়। তাকে ব্যঙ্গ করে ‘কবি’, ‘কথাশিল্পী’ বলা হতে থাকে এবং ‘তোর হবে’ বলে কটাক্ষ করা হয়।
২. সৃষ্টির একাগ্রতা: এই উপহাস তপনকে দমাতে পারেনি। বরং সে লুকিয়ে হোম টাস্কের ক্ষতি করে আরও দু-তিনটি সম্পূর্ণ গল্প লিখে ফেলে। সে বুঝল কল্পনার জগতে প্রবেশ করার যে আনন্দ, তা বাইরের কোনো বিদ্রূপের কাছে হার মানে না।
এই গভীর একাগ্রতাই প্রমাণ করে তপন ক্ষণিকের শৌখিন লেখক ছিল না, তার অন্তরে খাঁটি এক সাহিত্যিকের রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল।

প্রশ্ন 14: ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকাটির আগমন এবং তাকে কেন্দ্র করে পারিবারিক নাটকের বিবরণ দাও। [মান: 5]

উত্তর: পত্রিকার আগমন: দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও বিষণ্ণতার অবসান ঘটিয়ে একদিন বিকেলে মেসোমশাই ও ছোটোমাসি হাতে এক সংখ্যা ‘সন্ধ্যাতারা’ নিয়ে তপনদের বাড়িতে উপস্থিত হন। সূচিপত্রে ‘প্রথম দিন’ গল্প এবং লেখক হিসেবে শ্রীতপন কুমার রায়ের নাম দেখে তপনের উত্তেজনায় বুক কেঁপে ওঠে।
পারিবারিক নাটক:
১. উল্লাস ও শোরগোল: সারা বাড়িতে শোরগোল পড়ে যায়। আত্মীয়স্বজনরা এসে গল্পটি দেখে বাহবা দিতে থাকে।
২. মেসোর চাতুর্য: মেসোমশাই মৃদু হেসে বলেন যে কাঁচা লেখা বলে তাকে একটু-আধটু কারেকশান করতে হয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি পুরো কৃতিত্ব নিজের ঝুলিতে টেনে নেন।
৩. তোষামোদি ও বিদ্রূপ: পরিবারের বড়রা মেসোমশাইয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন এবং বলেন মেসো না থাকলে তপনের লেখা কোনোদিন ছাপা হতো না।
৪. তপনের অন্তর্ধান: উৎসবের সমস্ত আলো মেসোমশাইয়ের দিকে ঘুরে যাওয়ায় আসল স্রষ্টা তপন নিঃশব্দে একপাশে হারিয়ে যায়।

প্রশ্ন 15: ‘তার চেয়ে দুঃখের কিছু নেই, তার থেকে অপমানের!’—উদ্ধৃতিটির আলোকে তপনের আত্মমর্যাদাবোধ ও ট্র্যাজেডি বিশ্লেষণ করো। [মান: 5]

উত্তর: উদ্ধৃতাংশটিতে এক সংবেদনশীল কিশোরের আত্মমর্যাদাবোধের চরম ট্র্যাজেডি মূর্ত হয়ে উঠেছে:
১. ট্র্যাজেডির স্বরূপ: তপন চেয়েছিল একজন প্রকৃত লেখক হিসেবে পরিচিত হতে। কিন্তু তার সামনে এমন এক পরিস্থিতি উপস্থিত হলো যেখানে তাকে অন্যের লেখা গল্পকে নিজের বলে পড়তে হচ্ছে। নিজের তৈরি করা ঘরে অন্য কারও আধিপত্য মেনে নেওয়ার মতো এটি ছিল এক অসহ্য আত্মপ্রবঞ্চনা।
২. দ্বিবিধ অপমান: একদিকে মেসোমশাই তার অপটু সারল্যকে দয়া দেখিয়ে মুছে ফেলেছেন, অন্যদিকে আত্মীয়রা সেই দয়াকেই বড় করে দেখে তপনের প্রতিভাকে অগ্রাহ্য করেছে।
৩. আত্মমর্যাদার বিজয়: তপন এই অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ করেনি। সে মিথ্যা খ্যাতির আলোয় গা ভাসিয়ে না দিয়ে চোখের জলে নিজের গ্লানি ধুয়ে ফেলে আত্মমর্যাদার এক নতুন চূড়ায় উঠেছে। অন্যের ধার করা পোশাকে রাজা সাজার চেয়ে নিজের নগ্ন সত্য নিয়ে দাঁড়ানোই যে বড়—এই ট্র্যাজেডি তাকে সেই অমর সত্যের সন্ধান দিয়েছে।

প্রশ্ন 16: ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্প অবলম্বনে আশাপূর্ণা দেবীর ছোটোগল্প রচনার শিল্পকুশলতা ও চরিত্রায়ণের দক্ষতা আলোচনা করো। [মান: 5]

উত্তর: বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক আশাপূর্ণা দেবী ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে অসাধারণ শিল্পদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন:
১. টানটান প্লট ও নাটকীয়তা: গল্পটি এক কিশোরের নিষ্পাপ কৌতূহল দিয়ে শুরু হয়ে ক্রমে আশা, দ্বিধা, আনন্দ এবং শেষে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত ও ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছেছে।
২. বাস্তবসম্মত চরিত্রায়ণ: তপনের কিশোরসুলভ সারল্য ও গভীর আত্মসম্মান, মেসোমশাইয়ের আত্মতুষ্ট অভিভাবকত্ব, ছোটোমাসির চটুল বন্ধুত্ব এবং বাবা-কাকুর সনাতন তাচ্ছিল্য—প্রতিটি চরিত্রই রক্তমাংসের ও জীবন্ত।
৩. পরিমিতিবোধ ও ভাষা: কোথাও কোনো অহেতুক দীর্ঘ বর্ণনা নেই। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, তীক্ষ্ণ ও ইঙ্গিতবাহী সংলাপে গল্পটি প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
৪. মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা: এক সংবেদনশীল শিশুর অন্তর্জগতের তোলপাড়কে লেখিকা যেভাবে সূক্ষ্ম তুলির টানে এঁকেছেন, তা বাংলা ছোটোগল্পের ইতিহাসে অনন্য।

প্রশ্ন 17: ‘আশাপূর্ণা দেবী মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের এক অনন্য রূপকার’—পাঠ্য ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্প এবং তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনীর আলোকে মন্তব্যটির যাথার্থ্য বিচার করো। [মান: 5]

উত্তর: আশাপূর্ণা দেবী কোনো প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা ছাড়াই কেবল নিজের অসামান্য পর্যবেক্ষণশক্তি ও তীব্র সংবেদনশীলতার জোরে বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের অন্তরমহলের এক অমর রূপকার হয়ে উঠেছিলেন:
১. ঘরোয়া দ্বন্দ্বের নিখুঁত চিত্র: ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে যৌথ পরিবারের অভ্যন্তরীণ ঈর্ষা, নতুন জামাইকে তোষামোদ করা, কিশোরদের ইচ্ছাকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং কথার ছলে বিদ্রূপ করার যে মানসিকতা লেখিকা দেখিয়েছেন, তা মধ্যবিত্ত সমাজের চিরন্তন রূপ।
২. আত্মমর্যাদার লড়াই: তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’, ‘সুবর্ণলতা’ এবং ‘বকুলকথা’র মতো ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পেও তিনি ব্যক্তিত্ব ও আত্মমর্যাদার সংকটকে তুলে ধরেছেন। তপন যেন সেই অবহেলিত সত্তারই এক পুরুষ রূপ।
৩. ভাষার সারল্য ও ব্যঞ্জনা: আটপৌরে কথ্য ভাষার ভেতর দিয়ে গভীর জীবনসত্য ফুটিয়ে তোলাই তাঁর সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য।
সুতরাং, নিজের জীবনাভিজ্ঞতা দিয়ে তিনি বাঙালি মধ্যবিত্তের মনোজগৎকে যেভাবে ধারণ করেছেন, তা তাঁকে চিরস্মরণীয় রূপকারের মর্যাদা দিয়েছে।

প্রশ্ন 18: ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে সমকালীন শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক মানসিকতার যে প্রতিচ্ছবি দেখা যায়, তা বর্ণনা করো। [মান: 5]

উত্তর: ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পটি আপাতদৃষ্টিতে একটি পারিবারিক গল্প হলেও এর পরতে পরতে তৎকালীন সামাজিক ও শিক্ষাগত মানসিকতার সমালোচনা লুকিয়ে রয়েছে:
১. যান্ত্রিক হোম টাস্ক বনাম সৃজনশীলতা: তপনের মা বিয়েবাড়িতেও হোম টাস্কের খাতা আনিয়েছেন। সমাজ পড়াশোনা বলতে কেবল পরীক্ষার পড়া ও স্কুলের কাজ বোঝে; সাহিত্য বা মৌলিক চিন্তাকে সময় নষ্ট ও অনর্থক উপহাসের বিষয় মনে করে।
২. মুখস্থ ও অনুকরণের সংস্কৃতি: মেসোমশাই উল্লেখ করেছেন শিশুরা গল্প লিখতে গেলেই রাজা-রানি বা অ্যাক্সিডেন্টের মতো ধার করা বিষয় লেখে। অর্থাৎ তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে ভাষায় রূপ দেওয়ার শিক্ষা পরিবার বা বিদ্যালয় দেয় না।
৩. তোষণনীতি ও যোগাযোগপ্রীতি: সমাজে মেধার স্বাধীন মূল্যায়নের চেয়ে পরিচিতি, প্রভাব ও সম্পর্কের জোরে সাফল্য অর্জনের পথকেই স্বাভাবিক ও প্রশংসনীয় ধরা হয়। তপনের সংগ্রাম এই অচলায়তন মানসিকতার বিরুদ্ধেই এক তীব্র প্রতিবাদ।

প্রশ্ন 19: ‘তপন বইটা ফেলে রেখে চলে যায়...’—তপনের এই প্রস্থানের অন্তরালে যে গভীর নীরব প্রতিবাদ রয়েছে, তা বিশ্লেষণ করো। [মান: 5]

উত্তর: আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে তপনের বই ফেলে ছাতে চলে যাওয়ার ঘটনাটি নিছক এক বালকের অভিমান নয়, এটি ছিল সমগ্র কপট ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক নিঃশব্দ অথচ তীব্র বিদ্রোহ:
১. কপটতার আসর ত্যাগ: নিচে ড্রয়িংরুমে তখন মেসোমশাইয়ের করুণা আর আভিজাত্যের স্তাবকতা চলছিল। সেই অসত্যের উৎসবে তপন অংশীদার হতে চায়নি।
২. সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা: যে বইটিতে তার নিজের কোনো শ্রম ও শব্দ নেই, তাকে আঁকড়ে ধরে মেকি গৌরব উপভোগ করার লোভ তপন ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে।
৩. আত্মশুদ্ধি ও উত্তরণ: নির্জন ছাদের মুক্ত আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে চোখ মোছার মাধ্যমে তপন তার সমস্ত অপটু দুর্বলতাকে জয় করে। এই প্রস্থান আসলে ভীরুতার নয়, বরং এক স্বাধীন স্রষ্টা হিসেবে নিজের আত্মমর্যাদাকে পুনরুদ্ধার করার বিপ্লবী পদক্ষেপ।

প্রশ্ন 20: মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পটির প্রাসঙ্গিকতা এবং শিক্ষার্থীদের কাছে এর চিরন্তন শিক্ষণীয় বার্তা আলোচনা করো। [মান: 5]

উত্তর: মাধ্যমিক বাংলা পাঠ্যসূচিতে ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পটি এক অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রেরণাদায়ী সংযোজন:
১. বয়সের সাযুজ্য: দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ঠিক তপনের বয়সি। এই বয়সের স্বপ্ন, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে তারা অনায়াসে নিজেদের মেলাতে পারে।
২. শিক্ষার বার্তা: গল্পটি শিক্ষার্থীদের শেখায় যে জীবনে শর্টকাট বা অন্যের সুপারিশের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘস্থায়ী আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায় না। প্রকৃত সাফল্য আসে নিজের আন্তরিক পরিশ্রম ও মৌলিক চিন্তার মধ্য দিয়ে।
৩. সৃজনশীলতার বিকাশ: অবাস্তব অনুকরণ ছেড়ে নিজের পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিকে প্রকাশ করাই সাহিত্যের মূল ধর্ম—এই বার্তাটি প্রতিটি শিক্ষার্থীকে নিজস্ব ভাবনায় সমৃদ্ধ হতে শেখায়।
৪. পরীক্ষার উপযোগিতা: ছোট প্রশ্ন, ব্যাখ্যামূলক ও ভাবধর্মী বড় প্রশ্নের ক্ষেত্রে গল্পটির মনস্তাত্ত্বিক স্তরগুলি বিশ্লেষণ করার গভীর সুযোগ রয়েছে।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post